করোনাভাইরাস তার ওপর আমফান

0
514

ঘূর্ণিঝড় আমফান বাংলাদেশের ১৯ জেলাতে আঘাত হয়েছে । তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালি, ভোলা, যশোর ও মাগুরা৷ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা লন্ডভন্ড করে ফেলেছে জনপদ৷ অন্যান্য এলাকার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে চলে গেলেও গাবুরার বিপন্ন মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন৷ তারা কবে আশ্রয়কেন্দ্রে ছাড়তে পারবেন জানেন না৷ কারণ তাদের ঘরবাড়ি, গবাদি পশু-পাখি, ফসল যা ছিলো তা সবই ঘূর্ণিঝড় উড়িয়ে নিয়ে গেছে, বাঁধ ভেঙে পানিতে ভেসে গেছে৷

গাবুরার জালিয়াখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরর আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো দুই হাজারের বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু অবস্থান করছেন৷ তাদের আপাতত আরো পাঁচ দিন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে৷

শ্যামনগরের গাবুরা ছাড়াও বুড়ি গোয়লিনী এবং আশাশুনির পদ্মপুকুর, প্রতাপ নগর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে৷ ওইসব এলাকার ১৭ টি পয়েন্টে বাধ ভেঙে গেছে৷ বাগেরহাট, খুলনা ও পটুয়াখালী জেলা৷ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এইসব এলাকায় পানি ঢুকে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে৷ আর অনেক বাড়িঘর উড়ে গেছে, মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে৷ আর লবন পানি ঢুকে যাওয়া ও নলকুপ ডুবে যাওয়ায় খাবার পানির সংকট তৈরি হয়েছে৷ তৈরি হয়েছে স্যানিটেশন সংকট৷ করোনায় আগেই তো মানুষ কাজকর্ম হারিয়েছে৷ আর এখন ফসল বাড়িঘর নষ্ট হওয়া নতুন সংকটে পড়েছেন এই এলাকার মানুষ৷ তাদের কাজ নেই, থাকার জায়গা নেই, ফসল নেই৷

আবহাওয়া অফিস জানায়, আমফানের চোখ পশ্চিমবঙ্গের দিকে হলেও লেজের দিক থেকে বাংলাদেশে আঘাত করে সুন্দরবন ও সংলগ্ন সাতক্ষীরায়৷ ফলে উপকুলের ওই বেল্টটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে৷ সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের সব উপজেলাই চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে৷

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঘূর্ণিঝড় মনিটরিং কেন্দ্রের সদস্য সচিব, নির্বাহী প্রকৌশলী মীর আবুল হাসেম জানান, ‘‘সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনাসহ উপকুলীয় এলাকায় ১৫০ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে গেছে৷ ফলে বাঁধের ভিতরে পনি প্রবেশ করেছে৷ এতে ফসল নষ্ট হয়ে গেছে৷ ঘূর্ণিঝড়ের সময় জোয়ার থাকায় পানি বেশি ঢুকেছে৷”

ঘূর্ণিঝড়ে সরাসরি কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তা সরকারি বা বেসরকারি কোনো সূত্র থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়নি৷ ঝড়ে কারণে উপকুলের জেলাগুলো বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে৷ এক কোটিরও বেশি মানুষ বিদ্যুত ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছেন৷ যারফলে তথ্য জানতে সময় লাগছে৷ ঝড়ের আগে ২৪ লাখ সাত হাজার ১১৯ জনকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়৷

দুর্যোগ এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, ‘‘ঝড় সরাসরি আঘাত করেনি বলে আশঙ্কার চেয়ে আমরা কম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি৷ তারপরও সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে৷ সবচয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ঘরবাড়ির৷ অনেক ঘরবাড়ি উড়ে গেছে৷ ঘূর্ণিঝড়ের আগেই ওইসব এলাকায় ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হয়েছে৷ আর ক্ষতির হিসেব করে পরবর্তী সহায়তা দেয়া হবে৷”

পরিবেশ, বন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এক প্রেসব্রিফিং-এ জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনে ১০টির বেশি কাঠের জেটি এবং ৩০ টির বেশি স্টাফ ব্যারাকের টিনের চালা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে৷ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বনবিভাগের ৬০ টির বেশি পুকুরে লবনাক্ত পানি প্রবেশ করেছে৷ সুন্দরবনের গাছ গাছালি ভেঙেছে৷ এরমধ্যে কেওড়া গাছ বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে৷ তবে আরো ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে৷ ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছে৷

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক অনলাইন ব্রিফিং-এ জনিয়েছেন ঘূর্ণিঝড়ে ৪৬টি জেলার এক লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে৷সন্ধ্যায় ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘‘প্রাথমিক হিসেবে ঘূর্ণিঝড় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে৷”

এ পর্যন্ত করোনার চলতি ত্রাণ সহায়তার বাইরে ওইসব এলকায় অতিরিক্ত তিন হাজার ১০০ মেট্রিক টন চাল, ৫০ লাখ নগদ টাকা, শিশু খাদ্যের জন্য ৩১ লাখ টাকা, গো খাদ্যের জন্য ২৮ লাখ টাকাও ৪২ হাজার শুকনা খাবারের পাকেট পাঠানো হয়ে বলে জানান তিনি৷

এদিকে, সুন্দরবন অ্যাকাডেমির নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল কাদির জানান, ‘‘এবার আগের চেয়ে বনের ক্ষয় ক্ষতি কম হয়েছে বলে ধারণা করছি৷ তবে এবারও সুন্দরবনের কারনে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা হয়েছে৷”