হতাশা কাটতে শুরু,আশাবাদী হয়ে উঠছে বিরোধী জোট

0
992

৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে না পেরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়েছিল রাজ্যের হতাশা। উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্বের ফলাফলে কর্মী সমর্থকদের সেই হতাশা কাটতে শুরু করেছে। আবারো আশাবাদী হয়ে উঠছে বিরোধী জোট। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া এই সময়কে বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে চায় না। তাই বিএনপির আন্দোলনে এ নির্বাচনের ফলাফল নতুন মাত্রা যোগ করবে। বর্তমান সরকারের পতন দ্রুত ত্বরান্বিত হবে।’
সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর উপজেলা নির্বাচন বিএনপি এবং তার জোটের জন্য নানাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে জনসমর্থন প্রমাণ ছাড়াও রাজনৈতিকভাবে আবারো সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে সহিংসতার ঘটনায় মামলার জন্য যারা এলাকায় ফিরতে পারছিল না, নির্বাচন উপলক্ষে ফিরেছে তারাও।
১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় যে ৯৭টি উপজেলায় ভোট হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯টিতেই চেয়ারম্যান পদে জিতেছে বিএনপি। তাদের জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীও জিতেছে ১২টি উপজেলায়। এর বাইরে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন চারটি উপজেলায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে জিতেছেন ৩৬টি উপজেলায়, আর দলের বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন একটিতে।
এই ফলাফল বিএনপি-জামায়াতের জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক তা বোঝা যায় পাঁচ বছর আগের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই ৯৭টি উপজেলার ৬৬টিতে চেয়ারম্যান পদে জিতেছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। আর বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জিতেন ১৪টিতে আর জামায়াত আটটিতে। সেই হিসাবে পাঁচ বছরের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ হারিয়েছে প্রায় অর্ধেক উপজেলা আর বিএনপি জিতেছে প্রায় তিনগুণ উপজেলায়। আবার সহিংসতা ও স্বাধীনতা বিরোধিতার কারণে জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে দেশ-বিদেশে বিএনপি চাপে থাকলেও উপজেলায় তাদের সঙ্গে সমঝোতা করেই ভোট করেছে বিএনপি। আর এই সমঝোতা দুই দলের জন্যই যে কার্যকর তার একটি প্রমাণও হয়েছে।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট করে ভোট করলেও কয়েক মাস পর উপজেলা নির্বাচনে ভোট করে তারা আলাদা। ফলে সেই নির্বাচনে দুই দলের কোনোটির প্রার্থীরাই ভালো করতে পারেননি আশানুরূপ।

আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে বিএনপি
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা অংশ না নেয়ায় আওয়ামী লীগের সহজ জয় ছিল অনুমেয়। কিন্তু এই নির্বাচন করতে না দেয়ার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল বিএনপি। ৫ জানুয়ারি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা করলেও ওইদিন কেবল আট সংসদীয় আসনে ভোট ঠেকাতে পেরেছিল বিএনপি-জামায়াত। এই নির্বাচনের পর ১২ জানুয়ারি সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এরপর বিএনপির ‘করুণ দশা’র খবরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর হয়ে আসে। এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও উপজেলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। এই নির্বাচন কাগজে কলমে নির্দলীয় হলেও দলগুলোর কোনো এক প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ার রীতি আছে। বিএনপি কেবল সর্বশক্তি দিয়েই লড়াইয়ে নামেনি, জামায়াত এবং জোটের অন্য শরিকদের সঙ্গে সমঝোতাও করেছে। আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচনে গেলেও তাদের জোটবদ্ধভাবেই মোকাবিলার কৌশল নিয়েছে বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা উপজেলা নির্বাচন জোটগতভাবে করার কৌশল নিয়েছিলাম। সেই কৌশল করে ফলও পেয়েছি। বেশিরভাগ উপজেলায় আমরা আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দিতে পেরেছি।’
আওয়ামী লীগ তো এককভাবে নির্বাচন করছে। আপনারাও জোটবদ্ধভাবে না করে একক নির্বাচন করে আলাদাভাবে নিজেদের অবস্থানটা বুঝতে পারতেন কি নাÑ জানতে চাইলে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এককভাবে নির্বাচন করলেও আমরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করতাম। তবে সেটা সামনে দেখা যাবে।’
দেশের ৪৮৭টি উপজেলার মধ্যে ৪৬৫টিতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বাকি ২২টিতে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা কারণে আপাতত হবে না নির্বাচন। এ অবস্থায় সারাদেশের বেশিরভাগ উপজেলায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর তুলনায় বেশিতে জিততে পারলে সরকারকে দাবি আদায়ে কার্যকর চাপ দেয়া যাবে বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা। তাই সব বিভেদ ভুলে সব উপজেলায় একক প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে জোর দিচ্ছে বিএনপি।
সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়া নেতাদের নতুন করে জাতীয় নির্বাচন দেয়ার দাবিতে জুন নাগাদ আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন নেতাদের। আর নভেম্বর নাগাদ দাবি আদায় করা যাবে বলেও আশা করছেন তিনি।

জাতীয় নির্বাচন বর্জন নিয়ে প্রশ্ন
প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন নিয়ে বিএনপিতে বিরোধ ছিল। নেতাদের একাংশ মনে করেন এই নির্বাচনে না যাওয়া বিএনপির জন্য বড় ভুল। তারা মনে করেন, দেশজুড়ে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী জনসমর্থনের কারণে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচন ঠেকানো সহজ হতো না। আবার বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কার কথা বললেও ভোটের লড়াইয়ে জোটের নেতা-কর্মীরা থাকলে প্রশাসন তেমন কিছু করতে পারত না বলেও মনে করেন এই অংশের নেতারা।
তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে অটল ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি মনে করতেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকলে প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারত না। এখন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্বে বেশিরভাগ এলাকায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জেতায় দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অবস্থান নিয়ে কথা উঠেছে দলের ভেতরই। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও বলছেন, বিএনপির সংসদ নির্বাচন বর্জন করে ভুল করেছে।
উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্বের ফলের পর জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মধ্যে কোনো আফসোস আছে কি-না, জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘দশম সংসদ নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক। ওই নির্বাচনে বিএনপি গেলে আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নিতো।’ কিন্তু উপজেলা নির্বাচন তো এই সরকারের অধীনেই গিয়েছেন আর প্রথম পর্বে জিতেছেনও। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তো আপনারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিততে পারতেন, এমন মন্তব্যের জবাবে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচন আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নয়। স্থানীয় নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না।’

জোট করলে ফায়দা বেশি
বিএনপি-জামায়াত উপজেলায় জোট করে ভোট করলেও সব এলাকায় হয়নি সমঝোতা। আর তাতে ফলও পক্ষে আসেনি।
বিএনপির প্রার্থী থাকায় শক্তিশালী অবস্থান থাকার পরও সাতক্ষীরার আশাশুনিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এ বি এম মোস্তাকিমের কাছে এক হাজার ১৬৮ ভোটের ব্যাবধানে হেরে গেছেন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মুর্তজা আলী। এখানে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম পেয়েছেন ২০ হাজারেরও বেশি ভোট।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াতের ত্রিমুখী লড়াইয়ের কারণে এখানে জিতে গেছে সরকার দল সমর্থিত প্রার্থী। এই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আবদুল কাদের জিতেছেন ২৪৯২৪ ভোট পেয়ে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ২৩ হাজার ৭১৬ ভোট। অর্থাৎ দু’জনের মধ্যে ভোটের ব্যবধান এক হাজার ২০৮ ভোট। আর এখানে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মজিদুল হক পেয়েছেন ১৮ হাজার ৮১০ ভোট। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচন আমরা জোটগতভাবেই করেছি। তবে কিছু কিছু জায়গায় সবাইকে একই পতাকাতলে সবাইকে আনতে পারিনি। সামনের দিকে এসব বিষয় আরও ভালোভাবে তদারকি করা হবে।’
প্রায় সব জায়গায় জোট করে ভোটে গেলেও জামায়াত কোনো কোনো জায়গায় আপনাদের ছাড় দিচ্ছে না। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জামায়াত আর বিএনপি আলাদা দল। আদর্শও ভিন্ন। তাই তাদের সঙ্গে আমাদের জোট সাময়িক এবং কৌশলগত। জামায়াত বিএনপিকে ছাড় না দিলে তাতে বিএনপির কিছু যায় আসে না।’

——–ঢাকা টাইমস———–