ভারতের তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চলে স্থবিরতা ॥
ভারতের তৈরি পোশাক শিল্প একটি বিশাল এবং ক্রমবর্ধমান শিল্প, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানিকারক, এবং বিশ্ববাজারে এর প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। এই শিল্প অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার উভয়কেই লক্ষ্য করে কাজ করে এবং নতুন প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ডের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী করছে। এটি ভারতের কৃষির পর সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত, যেখানে তিন কোটিরও বেশী মানুষ সরাসরি কাজ করে।
অনেকেই ভেবেছিল ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবে। কিন্তু পুরো উৎপাদন শৃঙ্খল ২০২৫-এর জুলাই মাস থেকে থেমে গেছে। এভাবে চললে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। মার্কিন ক্রেতারা এখন মেক্সিকো, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
পোশাক রফতানি কেন্দ্রগুলো আগে মেশিনের গর্জন, কাপড় কাটার ছন্দ, আর শ্রমিকদের নিরবচ্ছিন্ন কোলাহলে ভরে বেশ জমজমাট থাকতো চারদিক। অথচ এখন সেখানে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে , যখন বছরে অর্ধেক বিক্রি হয় বড়দিনের মৌসুমকে সামনে রেখে সেপ্টেম্বরে। এখন কেবল দেশীয় বাজার ও দীপাবলি মৌসুমের ওপরই ভরসা। একটি কারখানায় প্রায় ১০ লাখ ডলারের অন্তর্বাস মার্কিন বাজারের জন্য প্রস্তুত থাকলেও ক্রেতা মিলছে না।
এর মূল কারন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা ৫০ শতাংশ শুল্কে ভারতের রফতানি খাত বড় ধাক্কায় পড়েছে। এতে দেশটির পোশাক, চিংড়ি ও গয়নার বাজার কার্যত স্থবির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
ভারতের মোট ১৬ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তিরুপ্পুর থেকে আসে। এখানকার শত শত কারখানায় টার্গেট, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও জারার মতো বড় মার্কিন খুচরা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক সরবরাহ করা হয়। কিন্তু নতুন শুল্কের ঘোষণা আসার পর থেকেই সব ধরনের অর্ডার বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, সেপ্টেম্বরের পর থেকে উৎপাদনের মতো কোনো কাজ নাও থাকতে পারে।
নতুন শুল্ক আরোপে বাজারে প্রতিযোগিতায় ভারতের অবস্থা আরো দুর্বল হচ্ছে। আগে যেখানে ভারতীয় শার্ট মার্কিন বাজারে ১০ ডলারে বিক্রি হতো, শুল্কসহ এখন সেটি দাঁড়াবে ১৬ দশমিক ৪০ ডলারে। এর বিপরীতে চীনে দাম ১৪ দশমিক ২০ ডলার, বাংলাদেশে ১৩ দশমিক ২০ ডলার ও ভিয়েতনামে মাত্র ১২ ডলার। এমনকি যদি শুল্ক ২৫ শতাংশেও নেমে আসে, তাহলেও ভারত প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে থাকবে।
এই চাপ সামাল দিতে ভারত সরকার কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। যেমন, কাঁচামালের আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার। একই সঙ্গে বিকল্প বাজার খুঁজে পেতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির আলোচনাও জোরদার হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অনেক দেরিতে নেয়া উদ্যোগ। তাছাড়া এই উদ্যোগ যথেষ্টও নয়।
নতুন মার্কিন শুল্ক কাঠামোয় মূল শুল্কের সঙ্গে জরিমানা শুল্কও যুক্ত হওয়ায় ভারতের কিছু নিটওয়্যার পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক হার ৬৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে ভারতীয় পণ্যের দাম আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি।
মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধির কারণে ভারতের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প সংকটের মুখে পড়েছে, যা শ্রমিকদের চাকরি ও রপ্তানি ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।



