আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা সম্ভাবনা ও করণীয়

0
897

আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা সম্ভাবনা ও করণীয়

প্রফেসর . ইসরাত জাহান

একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক উৎকর্ষতায় সহশিক্ষা কার্যক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাধারণত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আন্তঃবিভাগ প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়ে থাকে। কিন্তু আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা খুব একটা দেখা যায় না। ঢাকাতে বিক্ষিপ্তভাবে হলেও চট্টগ্রামে বা দেশের অন্য কোথাও হয় না। চট্টগ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষার্থীদের মাঝে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তুলতে সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম যেমন ক্রিকেট, ফুটবলসহ সব ধরনের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে চট্টগ্রামে একক প্রচেষ্টায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ২০০০ সালে। শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি খেলাধুলা উন্নয়নে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও উৎসাহ দেখে বিশিষ্ট শিক্ষা ও ক্রীড়ানুরাগী প্রফেসর সরওয়ার জাহানের উদ্যোগে চট্টগ্রামের চারটি বিশ্ববিদ্যলয় নিয়ে দামপাড়া পুলিশ লাইন মাঠে প্রথম আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৫ সালে আটটি বিশ্ববিদ্যলয় নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় চট্টগ্রাম মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠে পুনরায় প্রফেসর সরওয়ার জাহানের উদ্যোগে দখিনা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হয়। অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য মহোদয়গণের উপস্থিতিতে মাননীয় সিটি মেয়র উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে আয়োজনের সফলতা কামনা ও শিক্ষার্থীদেরকে উৎসাহিত করেন। মেয়রের আন্তরিক সহযোগিতায় ফাইনাল ম্যাচগুলো এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত উৎসব মুখর পরিবেশে সফলভাবে পাঁচটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার ধারাবাহিক সহযোগিতায় আয়োজিত টুর্নামেন্টগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে খেলাধুলায় একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিযোগি খেলোয়াড়রা স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ক্লাবে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। যাদের মধ্যে ইয়াছির আলী (রাব্বি), ইরফান শুক্কুর, সাজ্জাদুল হক রীপন, নাইম হাসান উল্লেখযোগ্য। অন্য জেলা থেকেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় দখিনা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।

দখিনা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সফলতায় অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আন্তরিক সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় ফুটবল খেলায় পারদর্শী শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার কারণে ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম দখিনা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের আসর। দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট পর্যায়ের চট্টগ্রামের ১০টি দল এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেছিল। উৎসবমুখর পরিবেশে সফলভাবে প্রথম টুর্নামেন্ট শেষ করায় ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় টুর্নামেন্টের আয়োজনে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দ্বিতীয় দখিনা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে-২০১৯ শুরু হয়। এবারের টুর্নামেন্টে মোট ৯টি দল অংশগ্রহণ করছে। এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস)-এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ও মাসিক দখিনার আর্থিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০১৯। প্রধান অতিথি হিসেবে এ টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন মাসিক দখিনার সম্পাদক প্রফেসর সরোয়ার জাহান ও পিউরিয়া ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড এর পরিচালক মো. কফিল উদ্দিন।

খুব দুঃখের বিষয় দেশের বিভিন্ন ক্লাবের খেলায় এখন আর অগের মত দর্শক দেখা যায় না এবং আগ্রহ অনেক কম, যত বড় বাজেটের খেলা হোক না কেন খেলার মাঠের আনন্দ এখন আর নাই। তবে বিদেশি দলের খেলা হলে ভিন্ন কথা। খেলার মাঠে দর্শক আনতে পারে একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ। আর তার প্রমাণও মিলছে চট্টগ্রামে দখিনা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্টগুলোতে।

আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট আয়োজন একটি সময় উপযোগী উদ্যোগ যা শিক্ষার্থীদের আন্তরিক চাওয়া। সঠিক ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের টুর্নামেন্ট জাতীয় পর্যায়ে সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে আয়োজন করা সম্ভব। ফলে এই ধরনের টুর্নামেন্ট থেকে উঠে আসবে সুশিক্ষিত সুশৃঙ্খল জাতীয় পর্যায়ের মানসম্পন্ন খেলোয়াড়। এছাড়া পৃষ্ঠপোষকতা পেলে খেলোয়াড় তৈরিতে এমন প্রতিযোগিতা রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য অবদান। খেলাধুলার চর্চা ও প্রতিযোগিতা যুব সমাজকে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা এবং বিভিন্ন খেলার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে যুগান্তরকারী ভূমিকা রাখতে পারে এই আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা। আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যদি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট সঠিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা হয় তাতে দেশ, প্রতিষ্ঠান, নগরবাসী সকলেই উপকৃত হবে। দেশ পাবে সুশৃঙ্খল শিক্ষিত খেলোয়াড়। যার জন্য জনগণের বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোন টাকা খরচ হবে না। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করবে তারা তাদের প্রয়োজনে বাজেট রাখবে, প্রশিক্ষক রাখবে ও খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দিবে, খেলোয়াড়দের জন্য ভর্তি কোটা থাকবে। লেখাপড়ার পাশাপশি খেলাধুলার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে অর্ন্তভুক্ত হবে। শিক্ষার্থীরা সুযোগ পাবে সুস্থ চর্চা ও সুস্থ প্রতিযোগিতার যাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিযোগিতায় মনোনিবেশ করে সুশৃঙ্খল হবে। অপসংস্কৃতি, অপরাজনীতি, মাদক নেশা বা অন্য যে কোন বাজে কাজ থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা সহজ হবে। ফলে যুব সমাজের ভাল একটি অংশ সমাজের অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

চট্টগ্রামে এই আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্টের সুবাদে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের প্রয়োজনে প্রতিযোগিতায় ভালো করতে খেলোয়াড়দেরকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, প্রশিক্ষক রেখেছে, বাজেট রেখেছে, খেলোয়াড় কোটায় বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ দিচ্ছে এবং খেলাধুলার জন্য আলাদা বিভাগ করেছে। যার ফলে প্রতি বৎসর যখন চট্টগ্রামে দখিনা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্টের আয়োজন হয় তখন অংশগ্রহণকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী, শিক্ষকবৃন্দসহ কর্মকর্তাদের মাঝে একটি উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করে। স্যোশাল মিডিয়াসহ সবত্র টুর্নামেন্ট নিয়েই প্রচারণা চলে। চট্টগ্রামের সবকটি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দখিনা ক্রিকেট ও ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলেছে এবং আনন্দচিত্তে প্রতিযোগিতায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে প্রাণপণ লড়েছে। এখন চট্টগ্রামের অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার্থীদের কাছে দখিনা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট মানে মিনি বিশ্বকাপ।

তবে আরও সুন্দরভাবে এই আয়োজন করা সম্ভব। অপরিকল্পিতভাবে বেঁধে দেওয়া সীমিত সময়ের মধ্যে দল নির্বাচন করে মাঠে নামানো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য যেমন কঠিন তেমনি যারা টুর্নামেন্টের পৃষ্ঠপোষকতা বা আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে তাদেরকে যুক্ত করা সহজ কাজ নয়। এখানে মনে রাখা দরকার অংশগ্রহণকারি দলসমুহ কোন খেলাধুলার দল বা সংগঠন নয়, এক একটি উচ্চ শিক্ষপ্রতিষ্ঠান, তাদের মূল কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষিত করা। ফলে চলমান কার্যক্রম বাদ দিয়ে শুধু র্টুনামেন্টের কথা ভাবলে চলবে না। সঠিক ব্যবস্থাপনা যদি না হয় যারা টুর্নামেন্টে পৃষ্ঠপোষকতা করার আগ্রহ দেখান তারা হারিয়ে যেতে পারেন। সুন্দর উদ্যোগ অনেক সময় অব্যবস্থাপনা বা অপেশাদারিত্বের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও খেলার মাঠ না থাকা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতাতো আছেই। সঠিক উদ্যোগের অভাবে খেলাধুলায় বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা থাকার পরও আমরা পিঁিছয়ে আছি অথচ সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেট ও ফুটবলপ্রেমী। ছোট্ট শিশুও স্বপ্ন দেখে সাকিব, তানিম, মুশফিকের মত হওয়ার। সুতরাং বলতে পারি সার্দান ইউনির্ভাসিটির উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর সরওয়ার জাহানের উদ্যোগটা বেশ প্রশংসাযোগ্য ও সময়োপযোগী। চলতি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী প্রত্যক দলের জন্য শুভকামনা রইল। অশেষ ধন্যবাদ আয়োজক কমিটি ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সকলকে।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ,
সাদার্ন ইউনিভার্সিটি

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here