ভারতের পাশে কোন প্রতিবেশী বন্ধু দেশ নেই

0
282

ভারতের পাশে কোন প্রতিবেশী বন্ধু দেশ নেই

পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গনতন্ত্রের দেশ ভারত । কোনো দেশের একই সঙ্গে অনেকগুলো প্রতিবেশী থাকলে সবার সঙ্গেই বৈরী সম্পর্ক হতে দেখাটাও একটা বিরল ঘটনা। আজ সেই দেশই পরিণত হয়েছে একা, অস্পৃশ্য আর সন্দেহের প্রতীক হিসেবে। কেন? কারণ সহযোগিতা নয়, ভারত চায় প্রভুত্ব। বন্ধুত্ব নয়, চায় বশ্যতা। আর সেই প্রবণতা তাকে করেছে নিঃসঙ্গ ও প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে ভারত ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্ক রাখতে পারছে না। প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি অনেক কারণেই ঘটছে এবং এর পেছনে প্রধানত রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং ঐতিহাসিক বিষয়ের জটিলতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত নিজের পররাষ্ট্র নীতির দিকে যে পরিবর্তন এনেছে, তা প্রতিবেশী দেশগুলির কাছে প্রত্যাশিত ফলাফল এনে দেয়নি। যদিও ২০১৪ সালে ক্ষমতায় বসেই নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করাই তাঁর মূলনীতি।আজ ১১ বছর পর দেখা যাচ্ছে, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীদের সম্পর্কের উন্নতির চেয়ে অবনতিই হয়েছে বেশি।ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত রয়েছে নেপাল,ভুটান,মিয়ানমার,আফগানিস্তান,পাকিস্তান,চীন ও বাংলাদেশের।এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সঙ্গে রয়েছে সমুদ্রসীমান্ত।অর্থাৎ,এক লাইনে বলা যায়, মোট নয়টি প্রতিবেশী দেশ রয়েছে ভারতের।সীমান্তবর্তী না হলেও কাছাকাছি রয়েছে আফগানিস্তান। সর্বশেষ অন্যতম প্রতিবেশী বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের জেরে ভারত অহেতুক তার সঙ্গে সম্পর্ককে ‘নেতিবাচক’ করে রেখেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। যার কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো:

উগ্র জাতীয়তাবাদ:ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পাশ কাটিয়ে  উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারণার ক্রমবর্ধমান প্রভাব পররাষ্ট্র নীতির উপর প্রভাব ফেলেছে। মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তার সহযোগী দলগুলো জাতিগত এবং ধর্মীয় ঐক্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির চর্চায়। এর ফলে দেশীয় রাজনীতি প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ঝুঁকেছে, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চীন:মুখে বন্ধুত্বের হাসি,পেছনে ছুরি!চীন-ভারত সম্পর্ক মানেই দ্বৈত চরিত্রের কাহিনী। চীনের সমকক্ষ না হলেও পৃথিবীর দুই বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে চীনের অবস্থান ভারতের জন্য বরাবরই অস্বস্তিকর হয়ে রয়েছে। ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত বাংলাদেশের পরেই রয়েছে চীন। চীন-ভারত সম্পর্ক ইতিহাসে জটিল এবং দ্বন্দ্বপূর্ণ ছিল এবং মোদির শাসনামলে এ সম্পর্ক আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। ১৯৬২ সালের যুদ্ধ এখনও ভারতের মনোবলে দগদগে ক্ষত।লাদাখ সীমান্তে প্রতিদিন উত্তেজনা, অনুপ্রবেশ, সেনা মোতায়েন।২০২০ সালে লাদাখ সীমান্তে চীনা বাহিনীর সাথে ভারতীয় বাহিনীর সংঘর্ষ এবং তার পরবর্তী উত্তেজনা দুটি দেশের সম্পর্ককে আরো খারাপ করেছে। চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক অবনতির একটি বড় কারণ সীমান্ত বিরোধ এবং ভারতীয় ভূখন্ডে চীনা বাহিনীর উপস্থিতি। অরুণাচল ও লাদাখে অবিরাম পাল্টাপাল্টি হামলা সবাই প্রত্যক্ষ করে আসছে। এর আগে তিব্বত নিয়ে বিরোধ ভারত আর এগোতে দেয়নি। এই সুবৃহৎ ভূখন্ডের উপর চীনের দাবি ভারত মানতে বাধ্য হয়েছে। যদিও তিব্বতের নেতা দালাই লামাকে দিল্লি আশ্রয় দিয়ে চীনের জন্য অস্বস্তি স্থায়ী করে রেখেছে। অন্যদিকে অরুণাচল রাজ্যের একটা বড় অংশকে তিব্বতের অংশ বলে চিহ্নিত করে চীন এর উপর তাদের দাবি অব্যাহত রেখেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে, চীনের সামরিক বাহিনী ভারতের অরুণাচল প্রদেশের প্রায় ৬০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়ে বলে স্থানীয় গুঞ্জনের পর এবার আরেক খবরে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে ভারতে। এই অরুণাচল প্রদেশেরই স্পর্শকাতর অঞ্চলের কাছে অত্যাধুনিক সুবিধা-সম্পন্ন হেলিপোর্ট বানাচ্ছে চীন। যদিও দুপক্ষেই এর সুস্পষ্ট কোনো স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির ঘোষণা পাওয়া যায়নি। অপরদিকে ভারতের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল লাদাখে কিছুদিন আগে দুই পক্ষের সেনাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা বিশ্বসংবাদ হয়েছিল। নতুন করে দিল্লির সমপরিমাণ এলাকা দখল করেছে চীন, এমনটাই দাবি করেছেন দেশটির জাতীয় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর মতে, লাদাখে নয়াদিল্লির আয়তনের সমান ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ভূমি দখল করেছে চীনা সেনারা। এটি একটি বিপর্যয় পরিস্থিতি বলেও জানিয়েছেন তিনি। চীন এবং ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, যা অতীতে অনেক সমৃদ্ধ ছিল, এখন নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের নানা বিতর্কে আছন্ন হয়ে পড়েছে। চীনের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক এবং বাণিজ্য পরিসরে ভারতে চীনা পণ্যের প্রতি সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি নীতির কারণে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। চীন এখন ভারতীয় অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে।চীন বিশ্ব-বাজারে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী,সীমান্তে তার প্রতিপক্ষ।মুখে বন্ধুত্ব,মাঠে লড়াই। এটাই দুই দেশের বাস্তবতা।২০১৯ সালের নভেম্বরে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিং নিজেদের মধ্যে বৈঠকে বসেছিলেন ব্রাসিলিয়াতে,অক্টোবর ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজান শহরে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের অবকাশে এক বৈঠকে বসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

নেপাল: নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত পুরনো এবং জটিল। একটা সময় ভারতকে ঈশ্বর ভেবেছিল,আজ সেই নেপাল ভারতকে দেখে সন্দেহের চোখে। এই সম্পর্ক নানা ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক কারণে টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। তবে নেপালে রাজতন্ত্রের স্থান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বদলে যাওয়ার পর থেকে এই সম্পর্ক  ব্যাপক উঠানামা করতে থাকে। চীনাঘেঁষা বামপন্থী সরকার বনাম ভারতঘেঁষা নেপালি কংগ্রেসকে ঘিরেই প্রধানত এই দ্বন্দ চলতে থাকে। ২০১৫ সালে ভারতের সংবিধান সংশোধন নিয়ে নেপাল প্রতিবাদ জানিয়েছিল, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো তিক্ত করে তোলে। ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে মাদেসি জনগণ যারা নেপালের সঙ্গে সীমান্তবর্তী ভারতীয় জনগণের অধিকার সম্পর্কে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি নেপালের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিল। নেপালের জনগণের মধ্যে এই সংশোধন নিয়ে বিরোধ গড়ে উঠেছিল এবং ভারতের প্রতি বিরোধিতার কারণে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে ভারত নেপালের বিরুদ্ধে একাধিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, যার মধ্যে ২০১৫ সালে ভারতের নেপালের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ ছিল অন্যতম। ভারতীয় অবরোধের ফলে নেপালে ব্যাপক মানবিক সংকট পড়ো এবং এটি নেপালের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাবকে তীব্র করেছিল। বিশেষত, ভারতীয় অবরোধের কারণে নেপালে খাদ্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ বিগ্নিত হয়েছিল, যা নেপালের সরকার এবং জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছিল। নেপালের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ করেছে।এতে ভারত ও নেপালের সম্পর্কের মধ্যে একটি গভীর ছায়া ফেলেছিল। এখনো নেপালে ভারত বিরোধিতা তুঙ্গে। নেপালের মূল তিনটি রাজনৈতিক দল (নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল বা ট্র্যাডিশনাল কমিউনিস্ট আর সশস্ত্র ধারার নতুন মাওবাদী কমিউনিস্ট) যারা একসাথে সংসদের মোট ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসনে প্রতিনিধিত্ব করা।এদের সবার সাথে ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে যায়। নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে —‘আমরা কারো অধীন নই!’ লিপুলেখ, কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা এখন সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ভারতের বন্ধুত্ব মানেই আধিপত্যের চেষ্টা।নেপাল স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে চায়,ভারতের ছায়ায় নয়।মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নেপাল সফর করেছেন পাঁচবার।

বাংলাদেশ:ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ‘বাংলাদেশ’ সর্বাধিক ‘মধুরতম’ সম্পর্কের কথা গৌরবের সঙ্গে উচ্চারণ করা হতো । অথচ বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে রয়েছে ভয়ানক আধিপত্য!ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে একাধিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু সেই সম্পর্কেই ঢুকে গেছে দখলদারি মানসিকতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে, দুই দেশের মধ্যে কিছু সংকট এবং বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে, যা সম্পর্কের উন্নতি থামিয়ে দিয়েছে। বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে ভয়ানক আধিপত্য!ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) এবং ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন (এনআরসি)-এর মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো বাংলাদেশের মধ্যে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, বিশেষত এগুলোর প্রভাব বাংলাদেশে বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর পড়তে পারে বলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বাঙ্গালীদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের প্রতি মোদি সরকারের অন্ধ সমর্থন, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি সম্পাদন, শোষণ ও লুণ্ঠন ইত্যাদি বাংলাদেশের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করেছে। তিস্তা চুক্তি আটকে থাকে বছরের পর বছর, আর সীমান্তে নিয়মিত ঝরে রক্ত। ভারতের দাদাগিরি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের মানুষ আর ভারতকে বিশ্বাস করে না। মধুরতম দেশটিও ভারতের রাডারের বাইরে চলে গেছে বলে ভারতীয়রা মনে করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত যেনো একেবারে ভেঙে পড়েছে।ভারতীয় মিডিয়ার একটি অংশ, সরকারি দল বিজেপি’র বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে অপতথ্য প্রচার করেন। ফলে,আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটে। এতে অনেকের ধারনা, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া এভাবে প্রকাশ করায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল তার নগ্ন চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। এই পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে ভারতের সাবেক কূটনীতিক টি এস তিরুমূর্তি তাঁর কূটনৈতিক পর্যালোচনা এসেছে এভাবে:“পরপর অনুষ্ঠিত হওয়া চারটি নির্বাচন বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে অপ্রতিরোধ্য করবে বলে যখন মনে হচ্ছিল, তখনই ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটলো। সেই পতন ঘটলো গণতন্ত্রের ঘাটতি, অর্থনৈতিক মন্দা আর ছাত্রবিক্ষোভের বিরুদ্ধে সহিংসতার ভারে। এর জন্য ভারত মোটেও প্রস্তুত ছিল না।” শেখ হাসিনা ও তার দলের পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্যান্য দলের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারতকে কেউ বাধা দেয়নি। ভারত কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।” ভারত দেখে বাংলাদেশকে ‘ছোট ভাই’ নয়,নিজেদের প্রভাবাধীন উপশাখা হিসেবে।বন্ধুত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু তার গায়ে জমে উঠেছে অবিশ্বাসের গাঢ় স্তর।

পাকিস্তান:ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি এক দীর্ঘ ইতিহাসের ফল। জন্ম থেকেই শত্রু! পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ক যেন যুদ্ধের ছাই থেকে জন্ম নেওয়া চিরন্তন শত্রুতার চিত্রকলা। ১৯৪৭ সাল ভৌগোলিক বিভাজনের রক্তাক্ত নাট্যমঞ্চ।স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশ অন্তত তিনটি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং বহুসংখ্যক প্রক্সি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। কাশ্মীর বিষয়ক বিবাদ,দফায় দফায় গুলী বিনিময় স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী পদক্ষেপ, এবং সীমান্তে উত্তেজনা প্রভৃতি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।দুদেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য দুই পক্ষই পরস্পরের প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়ে চলেছে গত পৌনে এক শতাব্দি জুড়ে।  ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের সম্পর্কের আবারো চরম অবনতি হয়।  মোদি সরকার আসলে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও কঠিন করে তুলেছে, যা তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনাকে তীব্র করেছে। এই সিদ্ধান্তের পর পাকিস্তান ভারতীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং ভারতকে এই সিদ্ধান্ত ফেরাতে চাপ দেয়। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর, পাকিস্তান ভারতীয় দৃষ্টিকোণকে চ্যালেঞ্জ করতে আন্তর্জাতিকভাবে চেষ্টা করেছে, বিশেষত জাতিসংঘের মাধ্যমে। মোদি সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর থেকে, দুই দেশের মধ্যে যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা স্থগিত রাখা হয়েছে, যা সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটিয়েছে। সীমান্তের ওপারে ক্রমাগত সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগ এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অভিযোজন সম্পর্কের আরও দুর্বলতা সৃষ্টি করেছে।ভারত-পাকিস্তান কূটনীতি মানে ষড়যন্ত্র, আর ‘সংলাপ’ মানে ছলনা। ভারত কখনোই পাকিস্তানের কাছে বন্ধু হতে পারেনি, শুধুই প্রতিপক্ষ। ২০২৫-এ কাশ্মীরের পাহালগাম হামলার প্রেক্ষিতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।চলমান সংঘাতে ভারতের অন্তত তিনটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত ভারত বিষয়টি স্বীকার করেনি।

ভুটান: একদা যে ভুটান ভারতের আস্থাভাজন ও প্রায় অনুগত রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত ছিল।ভারতের সবচেয়ে নিরাপদ,বিশ্বস্ত মিত্র ছিল।আজ সেটা সবচেয়ে শঙ্কিত।ভুটানও ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনের সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। ভেঙে গেছে সেই আস্থা। হিমালয় রাজ্য ভুটান এবং ভারতের প্রজাতন্ত্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঐতিহ্যগতভাবে ঘনিষ্ঠ এবং উভয় দেশই একটি ‘বিশেষ সম্পর্ক’ নিয়ে নিশ্চিত ছিল। ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যে ভারত প্রভাবশালী। ভুটান ভারতের বৈদেশিক সাহায্যের সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী। কিন্তু ১৯১৭ সালে এই সম্পর্কে চিড় ধরে। বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারত, ভুটান ও চীনের সীমানা যেখানে মিশেছে, সেই ‘ডোকলাম’ উপত্যকায় অব্যাহত সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই দিল্লি ও থিম্পুর কর্তৃপক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক কোনদিকে গড়াচ্ছে- তা নিয়ে ভারতের মধ্যেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ভারত ও ভুটানের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ প্রায় ৭০ বছরের পুরনো। হিমালয়ের পার্বত্য দেশ ভুটানকে ঘিরে দুশ্চিন্তা বাড়ছে ভারতেও। চীন-ভারত সামরিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ যখন পার্লামেন্টে বিবৃতি দেন, তখন বিরোধীদের সমালোচনা ছিল: বর্তমান সরকারের আমলে সব প্রতিবেশীর সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।ভুটান এখন দ্বিধায়, ভারতের সঙ্গে থাকলে সার্বভৌম সিদ্ধান্তে বাধা আসে।বন্ধুত্ব আছে, কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তে রয়েছ এক অদৃশ্য চাপ ।

মিয়ানমার: সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী মিয়ানমার তথা সাবেক বার্মা নিয়ে ভারত বেশ বেকায়দায় রয়েছে । ভারত একটি গণতন্ত্র-সমর্থক দেশ বলে দাবি করলেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তার প্রায় সবগুলো নির্যাতন ও নিবর্তনমূলক কর্মকান্ডের সহযোগী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে । এর প্রধান কারণ একদিকে চীনের মোকাবেলায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং দ্বিতীয় কারণ সেভেন সিস্টার্সকে মিয়ানমারের অস্থিরতা থেকে মুক্ত রাখা। কেননা ভারতের যেটুকু সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে রয়েছে তা সেভেন সিস্টার্সকেন্দ্রিক। তবে জান্তাবিরোধীরা যেভাবে শক্তি ও সাফল্য অর্জন করছে তাতে ভারত জান্তার উপর একতরফা ভরসা করে থাকতে পারছে না। চীনের প্রভাব বাড়ছে, ভারত সম্পর্ক র্দুবল হচ্ছে। সম্পর্ক আছে কিন্তু তা মূল্যহীন, প্রাণহীন।

শ্রীলংকা: ভারতের সমুদ্র সীমানার নিকটবর্তী দেশ শ্রীলংকা। এই দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অতীতে উজ্জ্বল থাকলেও বিভিন্ন সময়ে তাতে ঘাত-অভিঘাতের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। সম্প্রতি এই সম্পর্কেও বড়ো রকম ফাটল ধরেছে । শ্রীলংকায় শুরু হয়েছে ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলন। সম্প্রতি দেশটির কর্তৃপক্ষ ভারতের সাথে সম্পৃক্ত একটি কোম্পানিকে বিমানবন্দরে ভিসা প্রসেসিংয়ের দায়িত্ব হস্তান্তর করলে এই আন্দোলন গতি পায়। বলা হচ্ছে, শ্রীলংকায় ভারতীয় আধিপত্য রুখে দিতে শুরু হয়েছে এই আন্দোলন। সেখানে দেশটিতে ভারতের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তারা দাবি করে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ও কৌশলগত খাতগুলো এখন ভারতীয় আধিপত্যবাদের দখলে। এর একটি নমুনা দৃষ্টিগোচর হয়েছে বিমানবন্দরের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে। এক আন্দোলনকর্মী গণমাধ্যমকে জানান,“আমরা ভারতীয় আধিপত্যবাদের দাস নই। সে জন্য সরকার যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে আমরা আরো কঠোরভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবো।” প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের আমলে ভারতের সঙ্গে শ্রীলংকার সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায়। চীনপন্থী রাজাপক্ষে শ্রীলংকার দরজা চীনের জন্য হাট করে খুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু, ২০১৫-র জানুয়ারিতে রাজাপক্ষেকে হারিয়ে বিপুল জয় পান ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত মৈত্রিপালা সিরিসেনা। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা শ্রীলংকায় চীনা বিনিয়োগে নির্মীয়মান প্রকল্পগুলোর কাজ থামিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি আবার ঘুরে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা ক্ষমতায় আসার দু’বছরের মাথাতেই ফের শ্রীলংকায় বাড়তে শুরু করেছে চীনের প্রভাব।

মালদ্বীপ : ভারত মহাসাগরের আরেক সমুদ্র-প্রতিবেশী মালদ্বীপ নিয়েও স্বস্তিতে নেই ভারত। শতভাগ মুসলিম জন-অধ্যুষিত মালদ্বীপে নির্বাচন হলো বছর খানেক আগে। নির্বাচনের ফলাফলও ছিল ভারতের জন্য অপ্রত্যাশিত। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর বিশাল জয়ের জন্য নয়াদিল্লি প্রস্তুত ছিল না। তাই তার সঙ্গে আগে থেকে কোনো সংযোগও গড়ে তোলেনি। ভারত তখন প্রেসিডেন্ট নাশিদকে জোট গড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে পরামর্শ দিতে দ্বিধা করেনি। তবে নাশিদ সেই পরামর্শ শোনেননি। পরে তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ হারাতে হয়। নভেম্বর ২০২৩-এ মালদ্বীপের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোহাম্মদ মুইজ্জু দায়িত্ব নেয়ার পর, মালদ্বীপ ভারত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, ভারত ও মালদ্বীপ সরকারের প্রধানরা পরস্পরের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্যের অভিযোগ তুলে ‘অবমাননাকর মন্তব্যে’ জড়িয়ে পড়েন। ফলে,মালদ্বীপ এখন অনেকটাই চীনের প্রতি নির্ভরতা বাড়াতে শুরু করেছে ।

আফগানিস্তান : ভারতের সরাসরি সীমান্তে অবস্থিত না হলেও আফগানিস্তানকে অনেকটাই ভারতের প্রতিবেশী তুল্য মনে করা হয়। অতীতের নানান উত্থান-পতনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে অংশীদার ছিল ভারত। বিশেষত তালেবান বিরোধী অভিযানগুলোতে ভারত সেখানে রাজনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যের অংশীদারে পরিণত হয়। তবে ২০২১ সালের আগস্টে, তালেবান ফিরেছে, ফিরেছে শঙ্কা। তালেবানরা আফগানিস্তানে ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে ন্যাটোর বিদায়ের পর ভারতকেও পাততাড়ি গোটাতে হয়। ভারত এক কোণায় নির্বাক। পিছনে ফেলে আসতে হয় মধুভরা মৌচাক। সেই যন্ত্রণাও সইতে হচ্ছে ভারতকে।কাবুলে ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব নেই, নেই অর্থনৈতিক উপস্থিতিও। চীন, পাকিস্তান যারা তালেবানের সঙ্গে লেনদেন করছে, তারাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। ভারত হয়ে গেছে সেখানে এক অচেনা, অপ্রাসঙ্গিক নাম।

উগ্র জাতীয়তাবাদ, সীমান্ত বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে ভারত। চীন, নেপাল, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এই দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ভারতের আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোদির নেতৃত্বে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না এবং এর ফলে ভারতীয় পররাষ্ট্র নীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।পর্যবেক্ষকদের মতে, সাধারণভাবে ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে আয়তন, জনসংখ্যা এবং আর্থ-সামরিক শক্তি দিয়ে বিচার করে একপ্রকার ‘অবজ্ঞা’ করার নীতি নিয়ে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই নীতিই তার জন্য বুমেরাং হয়েছে । ভারত তার মত করে শর্তসাপেক্ষে সম্পর্ক গড়তে চায় এবং তার অধীনতায় এই অন্চলের নেতা হতে চায়,আর তাই  ভারত আজ নিঃসঙ্গ, চাপা আতঙ্কে, সম্পর্কহীন বন্ধুত্বের জালে জড়ানো। চারপাশে আজ শুধু সম্পর্কের শূন্যতা । ভারত ছিল দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্নের নেতা। আজ সেই দেশই পরিণত হয়েছে একা, অস্পৃশ্য আর সন্দেহের প্রতীক হিসেবে। কেন? কারণ সহযোগিতা নয়, ভারত চায় প্রভুত্ব। বন্ধুত্ব নয়, চায় বশ্যতা। আর সেই প্রবণতা তাকে করেছে নিঃসঙ্গ ও প্রশ্নবিদ্ধ।