ডিপ স্টেট: ক্ষমতার সমান্তরাল এক অদৃশ্য জগত

0
8

রাজনীতি বিজ্ঞানে বর্তমানে সবচেয়ে রহস্যময় ও আলোচিত শব্দবন্ধ হলো ‘ডিপ স্টেট’। সাধারণ অর্থে একে বলা হয় ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র’। যখন কোনো দেশে নির্বাচিত সরকার বা দৃশ্যমান নেতৃত্বের বাইরেও একটি স্থায়ী, অদৃশ্য এবং শক্তিশালী গোষ্ঠী পর্দার আড়াল থেকে দেশের মূল নীতিনির্ধারণ, ক্ষমতার পরিবর্তন বা স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে, যা তাদের নিজস্ব এজেন্ডা এবং লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে, স্বাধীনভাবে পরিচালিত অননুমোদিত গোপন ক্ষমতার নেটওয়ার্ক হিসাবে ব্যবহৃত হয়, তাকেই ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়। শব্দটির ব্যবহার আগে সীমিত থাকলেও বর্তমানে ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

ডিপ স্টেট’ শব্দটির গোড়াপত্তন হয়েছিল তুরস্কে । ১৯২৩ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ধর্মনিরপেক্ষকে সুরক্ষা ও নিশ্চিত করতে একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। এতে সামরিক অফিসার, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আমলাতন্ত্রের একাংশ যুক্ত ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল নির্বাচিত সরকার যদি কখনো আদর্শচ্যুত হয়, তবে পর্দার আড়াল থেকে তা নিয়ন্ত্রণ করা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এই ধারণা প্রবল। ১৯৫০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই, সিআইএ এবং পেন্টাগনের একটি স্থায়ী আমলাতন্ত্র রয়েছে যা হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এই তত্ত্বটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছায়, যখন তিনি অভিযোগ করেন যে ‘ডিপ স্টেট’ তার সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সম্প্রীতি যুক্তরাষ্ট্রে জেফরি এপস্টেইন বা এপস্টেইন ফাইল সর্ম্পকে চাঞ্চল্যকর যে তথ্য পাওয়া যায় এটাই ডিপ স্টেট । আধুনিক বিশ্বের একটি অন্ধকার আয়না। এটি শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নয়, এটি ক্ষমতা ও নৈতিকতার বৈশ্বিক ডিপ স্টেটের প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশে ‘ডিপ স্টেট’ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার মাধ্যমে। ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্ন— ‘২০২৪ সালের বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পেছনে কি মার্কিন ডিপ স্টেটের ভূমিকা ছিল?’—এটি গোটা বিশ্বে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দেওয়া তথ্য বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠী তাদের ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার টোপ দিয়েছিল। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, দৃশ্যমান রাজনীতির সমান্তরালে এক শক্তিশালী অদৃশ্য শক্তি সবসময় কাজ করে, যারা নিজেদের সুবিধামতো ক্ষমতার মেয়াদ বা পরিবর্তন নির্ধারণ করতে চায়। সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান যখন বলেন যে— একটি নির্দিষ্ট আদর্শের দলকে মূলধারায় আসতে না দেওয়ার চেষ্টা সফল হয়েছে, তখন প্রশ্ন ওঠে এই সিদ্ধান্ত কি শুধু আদর্শিক, নাকি এর পেছনেও কোনো গভীর রাজনৈতিক প্রকৌশল কাজ করেছে? ডিপ স্টেট যাকে চায় তাকেই সরকারের আসনে বসাতে কিংবা সরাতে সক্ষম—এমন একটি ধারণা এখন জনমনে বদ্ধমূল হচ্ছে।

ডিপ স্টেটের সাধারণত কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকে না। সাধারণত সরকারি সংস্থা বা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের একটি চক্র যারা সরকারি নীতির ওপর গোপন নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এই চক্র মূলত তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ, যখন কোনো নীতিনির্ধারকের ভাষা ও কর্মকাণ্ডে বিশেষ কোনো পক্ষের স্বার্থ বড় হয়ে দেখা দেয়, তখনই সেখানে ডিপ স্টেটের অস্তিত্ব আঁচ করা যায়। এটি অনেকটা “সিন্ডিকেট” বা “অদৃশ্য ব্যবস্থাপনার” মতো কাজ করে, যেখানে দৃশ্যমান সরকার শুধু কাগজে-কলমে অনুমোদন দেয়, মূল সিদ্ধান্ত হয় আড়ালে।’একটি কার্যকরী ‘ডিপ স্টেট’ মূলত ছয়টি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হয়:

১. স্থায়ী আমলাতন্ত্র: নির্বাচিত সরকার বদল হলেও উচ্চপর্যায়ের আমলারা তাদের পদে বহাল থাকেন। তারাই রাষ্ট্রের নীতি ও নথিপত্রের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক।

২. নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা: পর্দার আড়ালের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি নির্দিষ্ট অংশ, যারা তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে বা শান্ত করতে পারে।

৩. সামরিক নীতিনির্ধারণী স্তর: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার নামে অনেক সময় সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন।

৪. কর্পোরেট ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী: বড় পুঁজির মালিকরা তাদের ব্যবসার সুরক্ষায় বিশেষ কোনো পক্ষকে ক্ষমতায় দেখতে চায় এবং নির্বাচনে অর্থায়ন বা কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে প্রভাব ফেলে।

৫. মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডা মেশিন: সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যম প্রভাবকারিদের ব্যবহার করে জনমতকে বিশেষ দিকে প্রবাহিত করা ডিপ স্টেটের অন্যতম কৌশল।

৬. আন্তর্জাতিক শক্তি: বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশের ডিপ স্টেট এককভাবে কাজ করে না। এর সাথে পার্শ্ববর্তী দেশ বা প্রভাবশালী বিশ্বশক্তির গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের নিবিড় যোগসূত্র থাকে।

ডিপ স্টেট সরাসরি বন্দুক হাতে রাজপথে নামে না। তারা কাজ করে ছকে বাঁধা পরিকল্পনা অনুযায়ী। তাদের কাছে রাজনীতি হলো একটি দাবার বোর্ড। যখন কোনো নির্বাচিত সরকার তাদের স্বার্থে আঘাত হানে, তখন তারা তথ্য গোপন করা, প্রশাসনিক অসহযোগিতা, বিচারিক জটিলতা কিংবা মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

এখনকার যুগে শুধু জনসমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় আসা বা টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে হয় এই ‘ডিপ স্টেট’-এর সাথে আপস বা সমঝোতা করে চলতে হয়, নতুবা গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের মতো কঠোর পথে হাঁটতে হয়। তবে বিপ্লবের মাধ্যমে আসা সরকারকেও দ্রুতই এই স্থায়ী কাঠামোর অর্থাৎ আমলাতন্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হতে হয়, যা পুনরায় ডিপ স্টেটের জন্ম দেয়।

বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে (১৭ বছর) বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ‘ডিপ স্টেট’-এর যে শিকড় গেড়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—কোনো রাষ্ট্রে এই অদৃশ্য শক্তি শক্তিশালী হয়ে উঠলে সেখানে সত্যিকারের ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ’ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি ডিপ স্টেট ক্ষমতার একটি জটিল ও অন্ধকার দিক। যখন একটি নির্বাচিত বা অনির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের ওপর এই গোষ্ঠীটি পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করে, তখন জনস্বার্থের চেয়ে বিশেষ মহলের স্বার্থই রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রাধান্য পায়। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিচার বিভাগ স্বাধীনতা একান্ত প্রয়োজন।’

গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা। কিন্তু ডিপ স্টেট মূলত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেমন: পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি একটি বিশেষ বলয়ের অনুগত করে ফেলে। ফলে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের পথ গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং ডিপ স্টেটের সমান্তরাল শাসন থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে হলে দুটি প্রধান স্তম্ভের সংস্কার অপরিহার্য:

১. নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা: রাষ্ট্রের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত যেন জনসমক্ষে জবাবদিহিমূলক হয়।

২. বিচার বিভাগের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা: একমাত্র স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগই পারে পর্দার আড়ালের এই ‘অদৃশ্য শক্তি’র বেআইনি প্রভাবকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করতে।

পরিশেষে, যদি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী স্তরগুলো আমলাতান্ত্রিক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য না হয়, তবে ‘গণতন্ত্র’ কেবল একটি পোশাকি শব্দ হিসেবেই থেকে যাবে। প্রকৃত মুক্তি আসবে তখনই, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে নয়, বরং আইনি কাঠামো ও জনগণের সম্মতিতে পরিচালিত হবে।

সহজ কথায়, ডিপ স্টেট হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা একটি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিকে বোঝানো হয়, যা পর্দার আড়াল থেকে দেশের ভাগ্য লিখে থাকে। পর্দার আড়ালে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ নির্ধারণ করে বলে অভিযোগ করা হয় । একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বড় চ্যালেঞ্জ এই অদৃশ্য শক্তির প্রভাব কমিয়ে এনে জনগণের শাসন ও প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। নতুবা ভোট হবে, সরকার আসবে, কিন্তু আসল ক্ষমতা সবসময় থেকে যাবে পর্দার আড়ালে থাকা সেই ‘অদৃশ্য কারিগরদের’ হাতেই।