অগ্নিনির্বাপণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন জরুরি

0
662

অগ্নিনির্বাপণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন জরুরি : সরওয়ার জাহান

প্রতিনিয়ত যেভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে এখন কোথাও নিরাপদ বোধ করছে না মানুষ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের অগ্নিকাণ্ড এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এইসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ব্যবস’ার দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। অথচ আমাদের ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ও কর্মীরা যেকোনো দুর্যোগে নিজেদের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং আন্তরিকভাবে কাজ করে প্রাণপণ লড়ে যান বিপদগ্রস্ত মানুষদের সহযোগিতায় ।

এ মুহূর্তে বেশি প্রয়োজন ফায়ার সার্ভিস ব্যবস’ার আধুনিকায়ন। অগ্নি নির্বাপনে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। কিন’ আমাদের দেশে অধিকাংশ বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা গেছে। তাই অগ্নিনির্বাপনের ক্ষেত্রে ফায়ার হাইড্রেন্ট স’াপন হতে পারে একটি কার্যকর উদ্যোগ। অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় দ্রুত পানি সরবরাহের প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে ফায়ার হাইড্রেন্ট(অগ্নিনির্বাপণ কাজে ব্যবহৃত বিশেষ পাম্প যুক্ত পানিকল) স’াপন করা জরুরি।

ফায়ার হাইড্রেন্ট হচ্ছে পানির একটি সংযোগ উৎস যা পানির প্রধান উৎসের সঙ্গে যুক্ত থাকে। যে কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে এই উৎস থেকে পানি ব্যবহার করা যায়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, লম্বা পাইপের সাহায্যে ইচ্ছেমতো যে কোন দূরত্বে পানি সরবরাহ করা যায়। ঘনবসতিপূর্ণ ঘিঞ্জি এলাকার যেসব রাস্তায় অগ্নিনির্বাপক গাড়ি সহজে প্রবেশ করতে পারে না সেখানে এই ব্যবস’ায় পানি সরবরাহ বেশ কার্যকর। এটি রাস্তার ধারে স’াপিত এক ধরনের পানির কল বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় পানি সরবরাহ করা যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস’ায় বহু আগে থেকেই ফায়ার হাইড্রেন্টের ব্যবহার হয়ে আসছে । ফায়ার হাইড্রেন্ট উদ্ভাবন নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য জানা যায়নি তবে কারও কারও মতে ১৮০১ সালে তা আবিষ্কার হয় । তবে বাংলাদেশে এখনও এই ব্যবস’াটির ব্যবহার দেখা যায় না। যদিও বা দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে এ ব্যবস’া কিছুটা চোখে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় সব শহরে অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে এ ব্যবস’া গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি পাশের দেশ ভারতের কলকাতাও এর আওতায় আনা হয় সেই ইংরেজ আমলে। কলকাতার চেয়ে আমাদের পানির উৎস বেশি অথচ আমরা এই সুযোগ কাজে লাগাইনি। এত দুর্ঘটনার পরও আমাদের অপরিকল্পিত নগরে ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবস’া গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগই নেয়া হচ্ছে না।
কেন ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবস’া চালু করা সময়ের দাবি! কারণ ঢাকার চকবাজারে অগ্নি দুর্ঘটনার সময় প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের পুকুর থেকে পানির সংযোগ নেওয়া হয়েছিলো । সেই সময় মানুষের পায়ের চাপে সেই পানি প্রবাহ বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে পুকুর, খাল ও জলাশয় একেবারে নেই বললে চলে। ফলে যেকোন অগ্নিকাণ্ডে আমাদের পানির উৎস খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হয়। অথচ ফায়ার হাইড্রেন্ট স’াপন করে আমরা সে সমস্যার সমাধান করতে পারি।

আমাদের মেয়র, শহর উন্নয়ন কর্মকর্তা, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের কত দেশে সফর করেন এবং তারা এটাও জানেন, প্রায় সব উন্নত শহরে ফায়ার হাইড্রেন্ট স’াপন করা হয়েছে। কিন’ উন্নত বিশ্বের পরিকল্পনাগুলো আমাদের দেশে কেন প্রয়োগ করা হয় না তা একমাত্র অদৃশ্য শক্তিই জানে। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক হতে চললো, এখনও বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির প্রচলন দেখা যায়নি। সর্বশেষ ঢাকার চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় ৭০ জন, বনানীতে ২৫ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এখনো অনেকে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন, হয়তো মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে। এর আগে ২০১০ সালে ঢাকার নিমতলীতেও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। প্রতিবছর দেশে হাজারো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আর এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা, হারাতে হয় মূল্যবান জীবন। উন্নত বিশ্বের আদলে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় দ্রুত পানি সরবরাহ করতে ওয়াসা এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্যোগে অগ্নিঝুঁকি রয়েছে এমন শহরে রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে ফায়ার হাইড্রেন্ট স’াপন করা দরকার।

একটি ফায়ার হাইড্রেন্ট থেকে মিনিটে ৫০০ থেকে ১৫০০ গ্যালন পানি বের হয়। ফায়ার হাইড্রেন্টের জলাধারগুলো সাধারণত প্রাকৃতিক পানির উৎস যেমন নদী, খাল এর সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং এগুলোর অবস’ান পানির উৎস থেকে নীচুতে থাকে যাতে করে পানির সম-উচ্চশীলতার কারণে উৎস থেকে জলাধারে আপনা আপনি পানি চলে যায়। যার কারণে ফায়ার হাইড্রেন্টের পানির সরবারহ যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণই থাকে।

আমরা সাধারণত আগুন লাগার পর তা কিভাবে নেভানো হবে, সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করি । যদিও বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা উচিত আগুন লাগার আগেই। বাংলাদেশের পরিসি’তিতে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা পাওয়া সহজ নয়। কারণ রাস্তায় যানজট লেগেই থাকে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন এলাকায় সংকীর্ণ রাস্তাাঘাট। ফলে ইচ্ছা থাকলেও দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে ঘটনাস’লে গিয়ে আগুন নেভানো সম্ভব হয় না। অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রায়ই পানির সংকটের কথা জানা যায়। ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে খুব বেশি পানি থাকে না। কয়েক মিনিটেই এ পানি শেষ হয়ে যায়। বড় বিপণী বিতান বা আবাসনে আগুন লাগলে তা কিছুক্ষণ পর নেভানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই আগুন লাগলে তা কিভাবে নেভানো হবে তার একটি পরিকল্পনা আগেই করে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানি, বালির ব্যবস’া ও নেভানোর যন্ত্রপাতি এবং সেগুলো চালানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবল থাকা প্রয়োজন। যেকোন দুর্ঘটনা ঘটলে খবরে প্রচার হয়, ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হয়নি, এত তলার অনুমোদন ছিলনা, অগ্নিনির্বাপণে যথাযথ ব্যবস’া ছিলনা, ভবনের ইমার্জেন্সি সিঁড়ি নেই আরও কতকিছু। কিন’ প্রশ্ন হচ্ছে এসব দেখা যাদের দায়িত্ব তারা কোথায়? একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও এসব দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়না কেন?

এখন প্রশ্ন আসতে পারে অগ্নিনির্বাপণে যথাযথ ব্যবস’া না থাকার জন্য দায়ী কে বা কারা ? কিন্ত মূল আলোচ্য বিষয়কে পাশ কাটিয়ে কমকর্তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন কেন ঘটনা ঘটলো ? অবশ্যই তদন্ত করে সকলকেই বিচারের আওতায় আনতে হবে । প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়, সমস্যা প্রতিরোধে কিছু সুপারিশমালা তুলে ধরা হয়। তবে এই সুপারিশমালা প্রতিবেদনের মলাটে সীমাবদ্ধ থাকে। কিছু দিন পত্রপত্রিকার শিরোনাম হবার পর আবারো সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর পুরাতন সংস্কৃতি। কিন’ লাশের মিছিলতো বন্ধ হয় না ।

সমাধান কোথায়, কত দূর, হবে না কখনো সুস্পষ্ট নীতিমালার বাস্তবায়ন। শুধু উপলক্ষ হবে মিডিয়ায় বিতর্কের উপযোগ। কেউ বা আবার ঘটনা নিয়ে খেলবে রাজনীতির খেলা। নিজের দোষ যেখানে অন্যর ঘাড়ে চাপানো আমাদের স্বভাব সেখানে নীতিবোধের অভাব প্রকট। যারা হারিয়েছেন প্রিয়জন তারা এ ব্যথা বয়ে বেড়াবে আজীবন কিন’ তাদের অসহায় আর্তনাদ কি আমাদের প্রশাসনে কোন প্রভাব ফেলবে!