যানজট নিরসনে ওয়াটার ট্যাক্সি

0
673

যানজট নিরসনে ওয়াটার ট্যাক্সি : প্রফেসর সরওয়ার জাহান,

ঘর থেকে বের হতে ভয় হয়, সব সময় মনের মধ্যে শঙ্কা নিয়ে থাকি ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারবোতু? বর্তমানে চট্টগ্রামবাসীর কাছে ভয়াবহ আতঙ্কের বিষয় হলো যানজট। প্রতিনিয়ত যারা জীবিকার তাগিদে বের হয় তারাই জানে যানজটে কী পরিমাণ দুর্বিষহ কষ্টে তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে হয়। এটাই এখন নগরবাসীর নিত্য দিনের সাথী। খুব জরুরি কাজ ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার কথা চিন্তাই করে না। আধা ঘণ্টার পথ যেতে দুই/তিন ঘণ্টা লেগে যায় । এভাবে যানজটের কবলে নগরবাসীর জান ওষ্ঠাগত। তবে যানজট নিরসনে ফ্লাইভার নির্মাণ করা হলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। ফলে যানজটের বিষয়টা এখন অনেকটা মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁিড়য়েছে চট্টগ্রামবাসীর জন্য। মানুষ খুঁজে একটু স্বস্তি! এই দুঃসহ কষ্ট থেকে কিছুটা স্বস্তির পথ দেখাতে পারে ওয়াটার ট্যাক্সি। সড়ক পথের বিকল্প হিসেবে আমরা যদি জলপথকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে যেমন যানজট কমবে তেমনি আমাদের হারিয়ে যাওয়া জলপথগুলো উদ্ধারের একটা প্রচেষ্টা তৈরি হবে। প্রথমে ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন ব্রিজ থেকে পতেঙ্গা বিমান বন্দর পর্যন্ত জলপথে ওয়াটার ট্যাক্সি চালু করা যেতে পারে। এটা শুধু সড়ক পথের চাপ কমাবে তা নয় বরং পর্যটনের প্রসারতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সাধারণত চট্টগ্রাম শহরে বিনোদন কেন্দ্রের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আবার যেগুলো আছে যানজটের কারণে সেখানে যেতে মানুষ দুশ্চিন্তায় ভোগে। চট্টগ্রাম ভৌগলিকভাবে খুব সুন্দর একটি শহর। একই সাথে পাহাড় নদী সাগরের মিলনে এ সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা যদি জলপথকে কাজে লাগাতে পারি তাহলে এক দিকে যেমন শহরের সৌন্দর্য বাড়বে, তেমনি মানুষের বিনোদনের জন্য একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। তাই সময়ের দাবি অনুয়ায়ী চট্টগ্রাম শহরের জন্য জলবাহন বা ‘ওয়াটার ট্যাক্সি’ হতে পারে নতুন সংযোজন। ওয়াটার ট্যাক্সিতে ভ্রমণ যেমন খুবই উপভোগ্য তেমনি কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর থাকে নিশ্চিয়তা। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ঘুরে বেড়ানোর জন্য আকর্ষণীয় বাহন হিসেবে মানুষের প্রথম পছন্দ থাকবে এই ওয়াটার ট্যাক্সি।

বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ, চট্টগ্রামও নদী ও খাল বেষ্টিত অঞ্চল। আমরা চাইলে যাতায়তের জন্য খুব সহজে কর্ণফুলী নদীসহ খালগুলো কাজে পারি । বিশেষ করে কালুরঘাট/নতুন ব্রিজ থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত পানি পথে ৩০/৪০মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। অথচ এখন সড়ক পথে প্রায় ২/৩ ঘণ্টা লেগে যায়। যদিও দুই একটা কর্পোরেট অফিস বিমান থেকে নেমে নদী পারাপারের ব্যবস্থা রেখেছে, তাদেরই প্রয়োজনে। কিন্তু আজ তা পরিকল্পিত উদ্যোগ সকলের দাবী।

ওয়াটার ট্যাক্সির সুবিধা হলো কম সময়ে স্বাচ্ছন্দ্যেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে যাত্রীরা। সড়ক পথে এক দিকে যানজটের জ্বালা আবার তার উপর ভিক্ষুকের উৎপাত এ দুয়ে মিলে নগর জীবনে যাতায়তে নেমে আসে চরম অস্বস্তি। ওয়াটার ট্যাক্সি চালু হলে উপরোক্ত অসুবিধা যেমন কমবে তেমনি ভ্রমণেও আসবে স্বস্তি অর্থাৎ বাতাস খেতে খেতে প্রতিদিন কর্মস্থল থেকে বাসা এবং বাসা থেকে কর্মস্থলে র্নিবিঘেœ পৌঁছাতে পারবে মানুষ। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ এ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সফলতা পেয়েছে। ভেনিসসহ বিশ্বের অনেক শহর নদীপথ ব্যবহার করে একদিকে যেমন শহরের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে তেমনি ভ্রমনটাকে মানুষের কাছে বিনোদন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। চট্টগ্রাম দৃষ্টিনন্দন শহর, আমরা যদি এর প্রকৃত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতে পারি তাহলে পর্যটন ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার পথ উন্মোক্ত হবে।

শুরু করতে হবে তবেই ফলাফল আসবে। আমার বিশ্বাস ওয়াটার ট্যাক্সির প্রচলন শুরু করা গেলে বছরের মধ্যে যাত্রী সংখ্যা দ্বিগুণ এবং বাহন তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে । তবে শুধু অফিসে যাওয়ার জন্যই যে ওয়াটার ট্যাক্সির গুরুত্ব বাড়বে তা নয়, চট্টগ্রামবাসীর কাছে বিনোদনের অন্যতম প্রমোদ তরীও হতে পারে এই ওয়াটার ট্যাক্সি। দুই শিফটে সকাল ৬.৩০টা থেকে দুপুর আড়াইটা এবং দুপুর আড়াইটা থেকে রাত ৯.৩০টা পর্যন্ত নৌযানগুলো চলতে পারে। সব মিলিয়ে কম-বেশি ২০/৩০ জন চেকার ও কাউন্টার মাস্টার ওয়াটার ট্যাক্সিগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হতে পারে ।

কর্ণফুলী নতুন ব্রিজ থেকে যদি কেউ পতেঙ্গা বিমান বন্দর পর্যন্ত গাড়িতে যেতে চায় তাহলে যানজট পার হয়ে তার কমপক্ষে ৩ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। কিন্তু ওয়াটার ট্যাক্সিতে গেলে সময় লাগার কথা ৩৫ থেকে ৪৫ মিনিট। সরকার যদি অবকাঠামো তৈরি করে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিয়ে ওয়াটার ট্যাক্সি পরিচালনার ক্ষমতা প্রদান করে তাহলে খুব সহজে এ ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়ে ওঠবে। যাত্রী বহনে ওয়াটার ট্যাক্সির বিভিন্ন সিটের হতে পারে যেমন: ৩০, ৪০ বা ৫০ সিট।

চট্টগ্রমের কর্ণফুলী নতুন ব্রিজ থেকে যদি কেউ পতেঙ্গা বিমান বন্দর পর্যন্ত এই দূরত্ব সাধারণত: প্রতি শিফটে চলাচলকারী একটি ওয়াটার ট্যাক্সিতে দিনে জ্বালানির জন্য খরচ হয় ১৫/২০ লিটার তেল। শুরুতে যাত্রী কম হলেও আস্থে আস্থে স্বাচ্ছন্দ্যময় বাহন হিসেবে সবার মন জয় করে নেবে ওয়াটার ট্যাক্সি। ছুটির দিনে ওয়াটার
ট্যাক্সি চড়তে যাত্রীরা অধিকাংশই আসবে বিনোদনের জন্য। যানজট এড়িয়ে নদীর বাতাস উপভোগ করে যাত্রীরা স্বল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, ওয়াটার ট্যাক্সির যাত্রী সংখ্যাও তখন বৃদ্ধি পাবে । তবে ছুটির দিনে বিশেষ প্যাকেজ হিসেবে বিভিন্ন সিটের ওয়াটার ট্যাক্সির নৌ ভ্রমণের জন্য ভাড়া করবে পর্যটক দল। ফলে বিভিন্নভাবে এ ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়বে।

প্রাথমিক পর্যায় ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাত্রী উঠা-নামানো করার জন্য ৩টি থেকে ৫টি টার্মিনাল নির্ধারণ করা যেতে পারে। নতুন ব্রিজের নিচে টার্মিনাল, চাক্তাই, ফিরিঙ্গীবাজার সড়কের পাশে হয়ে ও সদরঘাট, ১৫ নং নৌ-জেটি এবং পতেঙ্গা বিমান বন্দর পর্যন্ত হতে পারে এই জলপথ । এই ইঞ্জিন চালিত ওয়াটার ট্যাক্সিতে ব্রিজের নিচে টার্মিনাল থেকে পতেঙ্গা বিমান বন্দর পর্যন্ত একবার যেতে ৪০-৫০ টাকা বা কিছু কম বা বেশি হতে পারে এর ভাড়া। যাত্রীদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে আরও নৌপথ চালু করা যেতে পারে ।

ঢাকাবাসীর তথ্যমতে- শুধু পরিবহন সেবা নয়, রাজধানীর হাতিরঝিলে ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস নগরবাসীর বিনোদনেও ভূমিকা রাখছে। এই সেবা চালু হওয়ার পর এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াটার ট্যাক্সির জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। নগরের বিভিন্ন স্থান থেকে শুধু ওয়াটার ট্যাক্সিতে চড়তে হাতিরঝিলে প্রতিনিয়ত ভিড় বাড়ছে সাধারণ মানুষের। যাতায়াতের পাশাপাশি বাড়তি বিনোদন অনেকেরই আগ্রহের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। অনেকেই এই ট্যাক্সিতে প্রতিদিনের যাত্রী হলেও কেউ কেউ বিনোদনের উপলক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছে এই ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিসকে। অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে ওয়াটার ট্যাক্সির ঘাটগুলোতে বেড়ে চলেছে যাত্রী সংখ্যা। যাত্রীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ট্যাক্সিকে উঠতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, বিশেষ করে বিকেল চারটার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে। তবে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ট্যাক্সির সংখ্যা কম হওয়ায় এ ভিড়ের মূল কারণ।

পানিপথ ব্যবহারের জন্য কোন স্বচ্ছ পানি প্রবাহের প্রয়োজন নাই। তবে থাকলে অবশ্যই ভাল। কালো ময়লা পানি পথকেও কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, দুদিকে সিমেন্ট বাধানো পাকা রাস্তা যা শুধু নির্ধারিত সাইকেল আর পদযাত্রীদের জন্য রাখা যেতে পারে। খালের দু পাশ জুড়ে সারিবদ্ধভাবে ঝোলানো সাদা সিরামিকের টবে ফুলের সারি হতে পারে । দুর্গন্ধ পথ দিয়ে এমনিতেই আমরা প্রতিনিয়ত হেঁটে চলেছি, কালো ময়লা পানি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পানি পথ ব্যবহার করার সুযোগ থাকা সত্তে¡ও তা আমরা কাজে লাগাতে পারছি না , এটা কিন্ত দুখঃজনক ব্যাপার !! যদি আমরা আমাদের জলপথকে কাজে লাগাতে পারি তাহলে নদী, খাল-বিলগুলো দখলদারদের হাতে থেকে রক্ষা পাবে। নদী ও খাল ভরাট করে প্রভাবশালীরা যেভাবে স্থাপনা তৈরি করছে তা বন্ধ হবে।

এতে শুধু ভোগান্তিই কমবে না, যাত্রীরা মনোরম দৃশ্যর অবলোকন করতে করতে গন্তব্যে যেতে পারবে। সময়ও বাঁচবে। পানির ধারে বসে থেকে প্রকৃতি উপভোগ করলে মানসিক শান্তিতে বিরক্তিও কমে যাবে। চমৎকার ব্যবস্থা হতে পারে চট্টগ্রামের জন্য। সবচেয়ে বড় কথা যানজট পুরোপুরি না কমলেও অন্তত অনেক মানুষের ভোগান্তি কমবে। এই উদ্যোগটা আমাদের নগর জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনে। এটা সর্বসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগের মাধ্যম। হাতিরঝিল থেকেও আমরা অভিজ্ঞতা নিতে পারি। নগর বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলেছেন- হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে চট্টগ্রামেই পরীক্ষামূলক ব্যবহার ছিল, অথচ আমরাই বঞ্চিত।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে আমাদের শহরেও ওয়াটার ট্যাক্সির প্রচলন হতে পারে । তবে মানসিকতার ব্যাপক পরিবর্তন ছাড়া সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া দুষ্কর । আমাদের দেশে উন্নত ভাবনার সঠিক বাস্তবায়ন হবে তখন? যখন আমরা বহিঃবিশ্বের উন্নয়ন দেখে হতাশ না হয়ে বাস্তবায়ন করবো । প্রশ্নে থেকে যায়, আমাদের উচ্চ পদস্থ হর্তাকর্তারা বিদেশ ভ্রমণ করে কী দেখেন আর কী শিখেন । প্রত্যাশা করি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নগরবাসীর প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেবেন। আশাবাদী মন আশায় আশায় থাকি।

12.03.18 প্রফেসর সরওয়ার জাহান, টেকসই উন্নয়নকর্মী