আমাদের বিচার সংস্কৃতি ও ঐশী কথন

0
867

আমাদের বিচার সংস্কৃতি ঐশী কথন

সাঈদ আহসান খালিদ

রাজনৈতিক শক্তিমানের উপরে মৃত্যুদন্ডের বিধান কীরূপে প্রয়োগ হয়সে যতই নৃশংস অপরাধী আর সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দন্ডপ্রাপ্ত হোক না কেনতাতো আমরা দেখেছি, দেখি ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদের তথ্য অনুযায়ীআমাদের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ২০০১ সাল থেকে এই অব্দি মোট ৩৩ জন অপরাধী কে সংবিধানের ৪৯ ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির মার্জনা প্রদান করা হয়েছে উনারা কি সবাই ধোয়া তুলসি পাতা ছিলেন? রাজনৈতিক বিবেচনায় নৃশংসতার সাত খুন মাফ হয়ে যায় কিন্তু মানবিক বিবেচনায় কিছু হয় না, হওয়ার নয়

আইনের স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করতে হলে আইনের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে ঈৎরসরহড়ষড়মু বা ‘অপরাধ বিজ্ঞান’ নামক একটি বিষয় অধ্যয়ন করতে হয়, পাশ করে আসতে হয়। এই ক্রিমিনোলজি বা ‘অপরাধ বিজ্ঞান’ নিজে কোন আইন নয়- এটি অপরাধের নানান কার্যকারণ, অপরাধ বা অপরাধী মনোবৃত্তির পেছনে অপরাধীর দৈহিক, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক প্রভাবক এবং কারণ নিয়ে আলোচনা করে। ক্রিমনোলজির মূলকথা হলো- কেউ জন্ম থেকে অপরাধী হয় না; সমাজ অপরাধী তৈরি করে। তাই অপরাধ ঘটলেই অন্ধভাবে বিধিবদ্ধ আইনের খড়গহস্ত অপরাধীর উপরে চাপিয়ে দেওয়ার নাম ‘ন্যায় বিচার’ বা জাস্টিস নয়- অপরাধীর অপরাধের কার্যকারণ অনুসন্ধান ও সেসবের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া ন্যায়বিচারের পূর্ব শর্ত।

মা-বাবাকে হত্যার ঘটনায় এক মামলায় অভূতপূর্বভাবে দু’ দুইবার ফাঁসির আদেশ পাওয়া ঐশী’র রায়ে আমি কোন ক্রিমিনোলিজিক্যাল কনসিডারেশন খুঁজে পেলাম না। অপরাধ বিজ্ঞানকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা হয়েছে- অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায়- এই রায়ে শুধু Retribution বা প্রতিশোধ দৃশ্যমান হয়, Reformative approach বা সংশোধনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অনুপস্থিত।

ঐশী’র ফাঁসিতে সবাই খুশি। ফাঁসি দিলেই ন্যায় বিচার নিশ্চিত- এটি আমাদের একটি জেনারেল দৃষ্টিভঙ্গি। আমজনতা খুশি- চরিত্রহীন বখাটে নেশাখোর মাইয়ার উচিত সাজা হইছে, রাজনীতিবিদ খুশি-দেশে আইনের শাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো, সাংবাদিক খুশি- মিডিয়া কাভারেজের হটকেক পাওয়া গেলো। ফাঁসির রায় এমনেই চাঞ্চল্যকর, তার উপরে সুন্দরী কিশোরী মেয়ের মাদকাসক্তি, ছেলেদের সাথে উশৃঙ্খলতার রগরগে খবর- লাখ লাখ সার্কুলেশন আর ইটিপি বৃদ্ধি। ঐশীর রায় ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ এর জ্যান্ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ক্রিমিনোলজিক্যাল ইস্যু ছাড়াও বহুবিধ কারণে এই রায় প্রশ্নবিদ্ধ। ঐশী মাদকাসক্ত ছিল। মা-বাবাকে খুনের পেছনে তাঁর মাদকাসক্তিকেই বড় ফ্যাক্টর বিবেচনা করা হয়েছে এতোদিন। মাদকাসক্ত অবস্থায় কৃত অপরাধের শাস্তি ‘ডাবল মৃত্যুদন্ড’ হয় কিনা সেটি বড় প্রশ্ন। মামলার রায়ে মাদকাসক্তির ব্যাপারটি আমলে নেওয়া হয়নি, হত্যাটি পরিকল্পিত হয়েছে বলে দৃঢ় সিদ্ধান্ত এসেছে রায়ে। যে স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ডাবল ফাঁসির রায় হয়েছে সেটি পরবর্তীতে ঐশী প্রত্যাহারের আবেদন করেছিল এই মর্মে যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে এই স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল- আদালতের রায়ে এসব ধোপে টেকেনি।

একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্স ছিল- ১৭ বছরের ঐশী আইনের চোখে অপ্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু ঐশীর জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং বয়স প্রমাণের অন্যান্য ডকুমেন্ট আদালতে গৃহীত হয়নি। আদালত মেডিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে রায়ে ঐশীকে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ বিবেচনা করেছেন। ঐশী কি আসলে প্রাপ্তবয়স্ক নাকি মাইনর- এই প্রশ্ন এখন সর্বাধিক আলোচ্য। কারণ ঐশীকে যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক বিবেচনা করা হয় তাহলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের এই পুরো বিচারটাই বাতিল হবে। কারণ শিশু আইন, ২০১৩ এর ৪ ধারামতে অনুর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হবে এবং তাঁর বিচার হবে শিশু আদালতে। একই আইনের ধারা- ৩৩ (১) মতে- কোন শিশুকে মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা কারাদন্ড প্রদান করা যায় না। এবং আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন কিশোর অপরাধীর মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়নি। ঐশী আদালতের চোখে প্রাপ্তবয়স্ক (পত্রিকান্তরে প্রায় ১৯ বছর) প্রমাণিত হলেও এটাতো পরিষ্কার যে তাঁর বয়স নিতান্তই কম, জীবনের উন্মেষ মাত্র! ১ বছর বেশি হওয়ায় ‘ডাবল মৃত্যুদন্ড’ আর ১ বছর কম হলে শিশু আইনের অধীনে অপরাধীর সুরক্ষার এই আকাশ পাতাল বিভেদ কি ন্যায়বিচারের চেতনাকে ধারণ করে? এই দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বয়স বিবেচনা করে লঘু শাস্তির আদেশ হয় কিন্তু শিশু আর প্রাপ্তবয়স্কের মাঝখানের ধুম্রজালে থাকা একজন বেপথু কিশোরীর বয়সের বিবেচনা প্রত্যাখ্যাত হয়!

আইনের মানবিক চোখে First time offender (প্রথমবার অপরাধী) আর Repetitive (পুনরাবৃত্তিমূলক) incorrigible (অসংশোধনীয়) offender কে এক পাল্লায় দেখা হয় না। প্রাপ্তবয়স্ক পেশাদার জাত সিরিয়াল অপরাধী আর নেশাগ্রস্ত বখাটেপনায় প্ররোচিত হওয়া সদ্য কৈশোর পেরোনো অভিযুক্তের দায় কিভাবে এক হয় কিংবা দ্বিতীয়টি কিভাবে অধিক হয়? আইনকে এখানে বড় কর্কশ আর নির্মমভাবে প্রয়োগ করা হলো। এখানে ডাবল মৃত্যুদন্ডের আর কি কোন বিকল্প ছিল না? আইন তো বিচারকের হাত পা বেঁধে রাখেনি। আমরা তো জানি বাংলাদেশে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদন্ডের কোন বিধান এখন আর নাই- এই ২০১৫ সালের মে’ মাসে বিখ্যাত কিশোর অপরাধী শুকুর আলী মামলায় সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ একমাত্র শাস্তি হিসেবে আইনে শুধু মৃত্যুদন্ডের বিধানকে বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। তাহলে? “Law can be blind; not the judge” এই প্রবাদটি গোল্লায় যাক।

ঐশী কি সমাজে একজন? ঐশীর মতো মাদকাসক্ত বেপথু তারুণ্য কি খুব দুর্লভ চারপাশে? কয়জনকে ‘ডাবল ফাঁসি’ দেবেন? ঐশীর অপরাধের দায় তাঁর একার কি? দায়িত্বহীন মা-বাবার অবহেলা কি দায়ী নয়? পরিবারের সীমাহীন লোভ আর অসততার বিলাসী জীবন কি অনুঘটক নয়? এই ইয়াবা ঐশীদের হাত পর্যন্ত কারা এনে দেয়, কিভাবে এনে দেয় তা কি কেউ জানে না? ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এখানে ফুলের মালা দিয়ে, গার্ড অব অনার দিয়ে বরণ করে জননন্দিত জনপ্রতিনিধি করা হয় আর তাঁদের লোভের শিকার বিচ্যুত কিশোর- তারুণ্যের প্রতিনিধি ঐশীকে ফাঁসির মঞ্চে যাবার ডাক আসে দু’ দুবার- জননিন্দা সমেত।

রাজনৈতিক শক্তিমানের উপরে মৃত্যুদন্ডের বিধান কীরূপে প্রয়োগ হয়- সে যতই নৃশংস অপরাধী আর সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দন্ডপ্রাপ্ত হোক না কেন- তাতো আমরা দেখেছি, দেখি। ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদের তথ্য অনুযায়ী- আমাদের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ২০০১ সাল থেকে এই অব্দি মোট ৩৩ জন অপরাধীকে সংবিধানের ৪৯ ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির মার্জনা প্রদান করা হয়েছে। উনারা কি সবাই ধোয়া তুলসি পাতা ছিলেন? রাজনৈতিক বিবেচনায় নৃশংসতার সাত খুন মাফ হয়ে যায় কিন্তু মানবিক বিবেচনায় কিছু হয় না, হওয়ার নয়।

আমি ঐশীর ডিফেন্স লইয়ার নই- ঐশীর মতো বিপদগামী, মাদকাসক্ত, নষ্ট তারুণ্য আমাদের কারো কাম্য নয়। কিন্তু শুধু ঐশীকে ডাবল ফাঁসি দিয়ে এই বেপথু, ক্ষয়িষ্ণু তারুণ্যের অপরাধকে নির্মূল করা সম্ভব নয়, সমাজের পচন ঠেকানোর জন্য একজন ঐশীর ফাঁসি কোনদিন ফরমালিন এর কাজ দেবে না। পাপ কে ঘৃণা করো; পাপী কে নয়।

ঐশী পারিবারিক মনযোগ আর যতœ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, তাঁকে মাদক ছাড়া আর কেউ ভালবাসেনি। আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়ে স্কুল খাতার ১২ পৃষ্ঠাজুড়ে লেখা ঐশীর সুইসাইড নোটটি এ যুগের হতাশ, বিচ্ছিন্ন আর নৈরাশ্যবাদী তারুণ্যের বয়ান যেন-

এমন কোনোদিন যেত না যে আমি কাঁদতাম না। জীবনের দুটো বছর নষ্ট হয়ে গেল। দুটো বছর একা একা কাটালাম। এ দুটো বছর যে কিসের ভেতর দিয়ে গিয়েছি, আমি আর ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ জানে না। এসব বলা এখন অর্থহীন। মনের ভেতর এক অজানা উল্লাস হচ্ছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, মৃত্যুর পর আমার পছন্দের জায়গায় চলে যাব। জায়গাটা পৃথিবীর মতোই হবে..।

বাংলাদেশের কোন নারী অপরাধীকে আজ অব্দি ফাঁসি কাষ্ঠে যেতে হয়নি, কোন মহিলা অপরাধীর মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়নি আজো। আইন আর ন্যায়বিচারের স্বার্থে ঐশীর ডাবল ফাঁসি কার্যকর হলে বিচারিক ইতিহাসে নতুন মাইলফলক সূচিত হবে।

ঐশী রহমানকে অগ্রীম অভিনন্দন!

সাঈদ আহসান খালিদ : শিক্ষক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

s.ahsankhalid@gmail.com

প্রকাশ দখিনা ৩৮