রাখাইনে গণহত্যা বিচারের কাঠগড়ায় মিয়ানমার: অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ গাম্বিয়ার

0
749

রাখাইনে গণহত্যা বিচারের কাঠগড়ায় মিয়ানমার: অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ গাম্বিয়ার

দখিনা ডেস্ক: ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের বাস্তবতায় জীবন বাঁচাতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে গত ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)-এ মামলা করে গাম্বিয়া। সেই মামলায় ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে  শুরু হয় বিচারকাজ যা  ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত চলবে।

মিয়ানমারে বিরুদ্ধে মামলার মূল উদ্যোক্তা গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। তিনি আন্তর্জাতিক গণহত্যা প্রশ্নে বিশ্বজুড়েই নন্দিত আইনজীবী। ব্রিটেনে আইন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করে গাম্বিয়া ফিরে আইন পেশায় যোগ দেন আবুবকর। তিনি রুয়ান্ডায় গণহত্যার বিচারে ২০০৩ সালে জাতিসংঘে যোগ দিয়ে তানজানিয়ায় রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটরের বিশেষ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। বলা হয়ে থাকে, আবুবকরের কৌশলী ও দৃঢ় ভূমিকার কারণে সাবেক সেনাপ্রধান আউগুস্টিন বিজিমুনিগোর ৩০ বছরের কারাদণ্ড হয়। মঙ্গলবার তিনি আদালতে বলেছেন, ‘আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে সারা বিশ্বের বিবেককে জাগ্রত করতে চাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কণ্ঠ জোরালে করতে চাই।’ আবুবকর মারি তামবাদু বলেছেন, কেবল মিয়ানমারই নয়, বিশ্বমানবতাই আজ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে।

অনেক দেশই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করতে পারত। মুসলিম বিশ্বের কেউই মিয়ানমারে বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসেনি। সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান বরাবর নিন্দা জানানো ও বিবৃতি দানের মধ্যেই সীমিত ছিল। মিয়ানমারের সঙ্গে চীন, রাশিয়া, আমেরিকা, ভারতের স্বার্থ রয়েছে। এসব দেশকে চটিয়ে এককভাবে কেউই মিয়ানমারের বিপক্ষে যেতে চায়নি। এ অবস্থায় গাম্বিয়া ওআইসিতে প্রস্তাব উত্থাপন করলে কেউ এর বিরোধিতা করতে পারেনি। এখানেই গাম্বিয়া অন্যদের থেকে এগিয়ে গেছে। আর সবাই যখন আহা-উহু করে, নিন্দা জানিয়ে বিষয়টি পার করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই গণহত্যার মামলা করে গাম্বিয়া সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল।

রাখাইনে মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা। এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ হচ্ছে গাম্বিয়া মিয়ানমারকে গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সবাই যখন নীরবে মিয়ানমারের গণহত্যা অবলোকন করছিল কিন্তু গণহত্যা বন্ধে তেমন জোরালো ভূমিকা রাখছিল না, তখনই এগিয়ে এল গাম্বিয়া। জাতিসংঘের জেনোসাইড কনভেনশন অনুসারেই একটি দেশ আরেকটি দেশের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ করতে পারে। মানবাধিকার, সম-অধিকারের বিষয়ে এত দিন যারা প্রথম সারির দেশ দাবি করতো, গাম্বিয়া সেই ধারণা পাল্টে দিল । দরিদ্র, ক্ষুদ্র দেশও যে মানবাধিকার, জন-অধিকারের পক্ষে কথা বলতে পারে, গাম্বিয়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মনে হচ্ছে, সারা বিশ্বের কথাই বলছে গাম্বিয়া । শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চিকে সভ্যতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের শিক্ষা দিচ্ছে গাম্বিয়া। অথচ অং সান সু চি যথারীতি গণহত্যার পক্ষেই কথা বলছেন। আশাকরি নোবেল প্রদানকারিরা শান্তিতে নোবেল দেওয়ার আগে ও পরে নুতন করে ভাববেন ।

আফ্রিকার রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গাম্বিয়ার যেমন কোনো প্রভাব নাই, তেমনি দেশ হিসেবে গাম্বিয়া খুব বেশি  পরিচিতও না। মুসলিম দেশ হিসেবে ওআইসিতেও গাম্বিয়াকে বড় ধরনের শক্তি হিসেবে কেউ বিবেচনা করে না। তবে গাম্বিয়া মানবিকতার দিক থেকে এখন শীর্ষেই থাকবে। হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্তের জন্য মামলা করেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে রায় যাই হউক। কিন্তু গণহত্যার মামলা হওয়াটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এখন অন্তত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারকে গণহত্যাকারী বলা যাবে। এতে করে মিয়ানমারকে সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আদেশ দিতে পারেন আদালত। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো রায় হলে নিরাপত্তা পরিষদে গিয়ে আটতে যেতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদে চীন ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে না।

পশ্চিম আফ্রিকার দরিদ্র এক দেশ গাম্বিয়া। জনসংখ্যা মাত্র ২০ লাখ। তিন দিকে সেনেগাল দিয়ে ঘেরা। আটলান্টিকের তীরে ছোট্ট উপকূল রয়েছে। ২০১৮ সালে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ঢাকা বৈঠকে গাম্বিয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে শেষ মুহূর্তে বিচারবিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদুকে পাঠায়। আবুবকর ওআইসির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান । রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার জন্য আবুবকর ওইআইসিতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং ওআইসিকে মামলায় সহযোগিতা করতে সম্মত করেন। এভাবেই আবুবকর পশ্চিম আফ্রিকার এক ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়াকে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সামনে নিয়ে আসেন।