সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: মত প্রকাশে শালীনতা এবং দায়িত্বশীলতা

0
1524

প্রযুক্তির বিশ্বে আজ অনলাইন মিডিয়া শক্ত জায়গা করে নিয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মূল ধারার মাধ্যম চ্যালঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। গ্রামের চায়ের দোকানে মানুষ তথ্যের জন্য এখন আর পত্রিকার পাতা ঘাঁটাঘাঁটি কমে গেছে । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম, লিংক্ট ইন ইত্যাদিই আমদের এই দেশে প্রচলন বেশী । এগুলি ছাড়া আরও অনেক আছে তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশ জনপ্রিয়। তবে যোগাযোগের মাধ্যমের শেষ নেই। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বর্তমানে ফেসবুকের প্রতি মানুষের অতিআসক্তির কারণে ফেসবুক সৃজনশীলতা প্রদর্শনে অনেক এগিয়ে । উন্নয়নশীল, স্বল্পউন্নত দেশগুলোতে এর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বি। জনপ্রিয়তায় অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চেয়ে ফেসবুক অনেক গুনে এগিয়ে । এ জনপ্রিয় মাধ্যম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কোন ধরণের আইন/নীতিমালা একসময় না থাকলেও অপব্যবহারের কারণে কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করা  হচ্ছে ইদানিং।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের আধুনিক জীবনে এক নতুন বাস্তবতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যহারের নিয়মকানুন ইন্টারনেটে, বিভিন্ন পত্রিকায় এবং বইয়ে যথাযতভাবে লিপিবদ্ধ আছে। সেখান থেকেও তা জানা সম্ভব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিভাবে শালীনতা, নৈতিকতা বজায় রেখে আচরণ করা প্রয়োজন তা নিয়েই লিখার চেষ্টা। কারন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত ছাপানোর দায়ে আর তা যদি নীতিমালা বা মূল্যবোধের পরিপন্থী হয় সে বঞ্চিত হতে পারে অনেক সুযোগ থেকে ।যদিও আমরা অনেকেই তা জানিনা । এখন সময় বদলেছে, পশ্চিমা বিশ্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র ভর্তির সময় ভর্তিচ্ছুদের প্রোফাইল পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এদেশেও অদূর ভবিষ্যতে এরকম ভর্তি পদ্ধতি বা আর্থিক সুযোগ নিতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রক্রিয়া শুরু করবে ।

সামাজিক মাধ্যম একজন ব্যক্তির একান্ত বিষয়/তার নিজস্ব চিন্তাভাবনা,দৈনন্দিন কাজকর্ম তার সহকর্মি, বন্ধুদের যোগাযোগ রক্ষার একটি মাধ্যম হিসাবেই বিবেচিত ।শেয়ার করা ছবি, ভিডিও, মতামত ইত্যাদির ওপর মন্তব্য করা যায়। আবার চলে পাল্টা মন্তব্যও। অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়   নিয়ে সম্পূর্ণ নীতিহীন ব্যপরোয়া আচরণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়। আমাদের দেশে ব্যবহারকারীদের মধ্যে এর কারণ চিন্তাশক্তি, ধৈর্য্য, সহনশীলতা কম হওয়ার কারণে অনেক সময় বেপোরওয়া আচরণ দেখা যায় । কোন মতামত সবার পছন্দ হবে এমন কথা নেই , অপছন্দ যদি হয়, সাবলিল ভাষায় নিজের বক্তব্য পুটিয়ে তুলা যায়। একটি নেতিবাচক বক্তব্য নিজের বন্ধুমহল ছাড়াও অন্যরাও দেখছে , এতে যার জানার কথা নয় সেও অপ্রয়োজনীয় ভাবে জেনে যাচ্ছে।আমাদের দেশে একটি কথা প্রচলিত আছে, ব্যবহারে বংশের পরিচয় । কেউ কাউকে না দেখলেও লেখা দেখে,  কৌতুক পড়ে বা ছবি দেখে অনায়াসে বিচার করতে পারে তার ব্যক্তিত্ব, ‍রুচি, পছন্দ-অপছন্দ ।তার শিক্ষা এমনকি পারিবারিক পরিবেশ।

ব্যক্তিত্ব যেমন সামাজিক চলাফেরায় দৃশ্যমান হয়, তবে সীমিত আকারে। তেমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নিজের ব্যক্তিত্বের কর্মকান্ডের ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক প্রকাশ পায় ব্যাপক আকরে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভাল দিকগুলো চর্চা করার মাধ্যমে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আরও সুস্থ ধারায় আসতে পারে। সৃজনশীল ব্যবহারের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সত্যিকার অর্থেই সার্থক হতে পারে।যে কোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আমদেরকে সামাজিক হতে হবে এবং তার জন্য আমাদেরকে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি প্রদান করেন । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁদের আচরনের জন্যও প্রশিক্ষন থাকা উচিৎ। অনেক দেশে নিয়োগের আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখে নেন তাঁর আচরন কেমন,শালীনতা, নৈতিকতা, নীতিমালা বা মূল্যবোধের পরিপন্থী আপত্তিকর কোন মন্তব্যে আছি কিনা ।  কোন কোন দেশ এখন ভিসা দেওয়র র্সত হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ হিসেব দেওয়া এখন নিয়মের মধ্যে রেখেছে ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন আমাদের নিত্যদিনের অংশ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে তরুণ ও কিশোর সমাজের। এতে বুদ্ধির বন্ধ্যত্ব তৈরি হচ্ছে, বিঘ্নিত হচ্ছে মেধার বিকাশ। মূল্যেবোধের অবক্ষয়, বিভক্তি সৃষ্টি, অনৈতিক ব্যবসা, সামাজিকভাবে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং ব্যক্তিগত ক্রোধের কারণে বিব্রতকর অবস্থায় বা কাউকে ঝামেলায় ফেলার মতো প্রভাব রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ।পিতা-মাতার উচিত তাঁর সন্তান কতসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করছে তার উপর নজর রাখা ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচিৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের শিক্ষার্থীরা কেমন আচরন করছে, নৈতিকতা, নীতিমালা বা মূল্যবোধের পরিপন্থী আপত্তিকর কোন মন্তব্যে করছে কিনা তার উপর নজরদারী করা । প্রয়োজনে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নেওয়া । বিশেষ করে নৈতিকতা, বিধি-বিধান সর্ম্পকে অবহিত করা । এই প্রশিক্ষনের ফলে শিক্ষার্থীরা যে কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা থেকে বেচেঁ যেতে পারে । ফলে সচেতন ভাবে আচরণ আশা করা যায়।  ফলে শির্ক্ষাথীরা মনোবিকারগ্রস্ত থেকে রেহাই পাবে ।এপ্রশিক্ষন এখন সময়ের দাবী। জরুরি হয়ে পড়েছে এসব আচরণবিধি সম্পর্কে শিক্ষার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক দিক অবশ্যই আছে । তবে এর নেতিবাচক ব্যবহারে সামাজিকতা, সৌজন্যবোধ আমরা হারাচ্ছি। আমাদের সমাজ এ সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নয়। অনলাইননির্ভর এই সামাজিক যোগাযোগ আমাদেরকে অসামাজিক করে ফেলছে ।প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন আমাদের নানা বিপদেও ফেলছে। জবাবদিহিতার অভাবে যা ইচ্ছে ছাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ যে কোনো মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও আশা করা হয়েছে যে, এই স্বাধীনতা ব্যবহার করতে গিয়ে প্রত্যেক নাগরিক যেন দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দেয়। এ স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, মানহানি অথবা অপরাধে উসকানি প্রদান হতে বিরত রাখার স্বার্থে যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ আরোপের ক্ষমতা দেওয়া আছে । শালীনতা, নৈতিকতা, মানহানি বা অপরাধে উসকানি প্রদান হতে বিরত থাকা ইত্যাদি কিছু নিয়মনীতি মেনে চলা সাপেক্ষে এই স্বাধীনতাটি উপভোগ করা কঠিন কোন কাজ নয়। প্রয়োজন সচেতেনতা ও শিক্ষা।

আমাদের প্রচলিত আইনগুলোর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে আইসিটি আইন ও সাম্প্রতিক ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে। আমাদের সবারই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ সর্বত্র শালীনতা বজায় রেখে দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। প্রচার করতে খরচ হয় না, যা ইচ্ছে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতে পারি না। তাতে শুধু নিজের নয়, মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অমিত সম্ভাবনাও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।যেকোন সময় যথাযত কতৃপক্ষের নজরদারিতে পড়লে ঝুঁকিও কম নাই ।

-সরওয়ার জাহান, টেকসই উন্নয়ন কর্মি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here