সন্দেহ প্রবণতা : একটি জটিল মানসিক রোগ!

0
18

সন্দেহ প্রবণতা : একটি জটিল মানসিক রোগ!

সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভালো থাকাই হোক বৈশ্বিক অগ্রাধিকার- এই প্রতিপাদ্যে নিয়ে ১০ অক্টোবর ২০২২ পালিত হলো এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, দেশে ৩ কোটি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এর ধরন ও লক্ষণ বিভিন্ন রকমের যা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ নানা রকম কাজ করে। আর এভাবেই গড়ে উঠে বিভিন্ন পেশা শ্রেণির মানুষ। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে আমাদের পেশাজীবন। উদীয়মান অর্থনীতির পরিবেশ গড়ে উঠার কারণে নতুন নতুন পেশায় নতুন নতুন ব্যবসার উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। কিন্তু প্রয়োজনীয়ভাবে পেশাদার জনবল তৈরি না হওয়ায় নানা পেশার নানা প্রতিষ্ঠান থেকে আগত মানুষের সংমিশ্রণে প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। যারফলে কর্মস্থল পেশাদারিত্ব না থাকায় বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রভাবে সন্দেহের মাত্রা বেড়ে চলছে।
বতর্মান সমাজ জীবনে সামাজিক সমস্যাবলীর মধ্যে সন্দেহপ্রবণতা অন্যতম একটি সমস্যা। কর্মক্ষেত্রে কর্তাব্যক্তিদের আত্ম-সন্দেহ প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সন্দেহপ্রবণতার প্রভাবে কর্মক্ষেত্রকে পিছিয়ে দেয়, উন্নয়ন ব্যহত হয়। সহকর্মীদের কাজের প্রতি আন্তরিকতা কমে যায়। প্রতিষ্ঠান তার স্বকীয়তা এবং পুরাতন অভিজ্ঞ জনবল হারায়। আত্ম-সন্দেহের এই প্রবণতাটি প্রতিটি মানুষের সহজাত ধর্ম। দারুণ আত্মবিশ্বাসী মানুষটিও কোন না কোন সময়ে নিজের প্রতি, নিজের কাজ নিয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠে। আত্ম-সন্দেহের প্রবণতা পুরোপুরিভাবে দূর করা সম্ভব অনেক সময় হয় না, তবে অভ্যাসের মাধ্যমে তা কমিয়ে আনা সম্ভব।এই ব্যাধি মূলত চেতনাকে আক্রান্ত করে বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু এটা একই সাথে প্রায়শই আচরণ এবং আবেগগত দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা বৃদ্ধি করে।
সন্দেহপ্রবণতা একটি ঘুণ যা শুধু নিজেকেই ধ্বংস করে না, চারপাশের সবাইকেই এক চরম নেতিবাচক পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। এই বৈশিষ্টের কারণে অনেকেই হতে পারে চরম ঘৃণিত, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝামাঝি যে নেতিবাচক অনুভূতি, যা মানুষের অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় আর সেটাই মুলত: সন্দেহ। এই অহেতুক, অমুলক সন্দেহের কোনো নির্দিষ্ট কারণ থাকেনা। তবে ব্যক্তির মনের মধ্যে সন্দেহ মাসের পর মাস বেঁচে থাকে অটলভাবে। যা যেকোনো মানুষের মধ্যেই আসতে পারে যেকোনো সময়ে এবং যেকোনো কারণে।
কর্মক্ষেত্রকে সুস্থ রাখতে বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞের পরামর্শে জানা যায়, অতি আগ্রহ, ভালবাসা, বিরক্তি-হতাশা আর ক্ষোভের সমন্বয়ে মানুষের মনে সন্দেহ জন্মাতে থাকে। এছাড়াও একগুঁয়ে মনোভাবাপন্ন মানুষের মাঝেও সন্দেহ প্রবণতা দেখা যায়। প্রতি মুহূর্তে সন্দেহের বীজ লালন করতে করতে মানুষ ভুলে যায় স্বাভাবিক জীবন। হয়ে উঠে বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিতে। যার প্রভাব পড়ে সবর্ত্র। যারফলে নিজে ভালো থাকতে পারে না অন্যদেরকেও ভলো রাখতে পারে না। ধীরে ধীরে আক্রান্ত হয় সিজোফ্রেনিয়ায়। সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল মানসিক রোগ। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে চিন্তাধারা এবং অনুভূতি প্রকাশের মধ্যে সঙ্গতি না থাকা। এতে মনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের বিঘœ ঘটে। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী সে কখনও বুঝেই না সে অসুস্থ। আত্মবিবেচনাবোধ হারিয়ে ফেলে, তার বিশ্বাসে অটল থাকে।এবং সে যে একটা মানসিক সমস্যায় ভুগছে সে কখনোই বিশ্বাস করতে চায় না। এই রোগকে মনোচিকিৎসকরা অনেক সময় মানসিক রোগের ক্যান্সার হিসেবেও উল্লেখ করেন। বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মেজবাহুস সালেহীনের মতে, সিজোফ্রেনিয়া মূলত মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কে সমস্যা, বংশগত কারণসহ একাধিক কারণে হতে পারে। সহকর্মী-স্বজনদের প্রতি ভ্রান্ত বিশ্বাস, অহেতুক সন্দেহপ্রবণতা, ভ্রান্ত অনুমান, অবাস্তব চিন্তাভাবনা, হ্যালুসিনেশন অবিশ্বাস, আবেগপ্রবণ, ষড়যন্ত্রের ভয়, অবচেতন মনের ভয়, চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া ইত্যাদি। এসব লক্ষণ বলে দেয় একজন মানুষ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। তাঁর মতে, সিজোফ্রেনিয়া রোগীরা কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, সিজোফ্রেনিয়া রোগ ও রোগী সম্পর্কে অনেকেই জানে না বুঝাও যায় না। সিজোফ্রেনিয়া রোগ ও রোগী সম্পর্কে ধারণা খুবই সীমিত থাকায় কারও ঘরে রোগী থাকলে কেউ বুঝতে পারে না। সচেতনতার অভাবে বর্তমানে এই রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঈর্ষা মানুষের খুব স্বাভাবিক একটি অনুভূতির নাম। এর কারণে মানুষের মনে জাগে সন্দেহ। অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন এবং মাত্রাতিরিক্ত সন্দেহ এবং আশ পাশের মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনে। কর্মক্ষেত্র ছাড়াও বর্তমানে পারিবারিক জীবনে একে অপরকে সন্দেহ এক মহামারী আকার ধারণ করেছে। সন্দেহ করে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে যখন এই সন্দেহের বিষ ঢোকে তখন সেই ঘরে আর সুখ-শান্তি থাকে না। প্রচÐ ভালোবাসা বা অন্যের সম্পর্কের ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখে নিজ মনে সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে। সন্দেহ যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে ওঠে তখন সেটি রোগে পরিণত হয়। ভালোবাসাজনিত সন্দেহপরায়ণতা মানসিক ব্যাধিকে প্যাথলজিক্যাল জেলাসী অর্থাৎ বিকার গ্রস্থ ঈর্ষা বা ওথেলো সিনড্রোম বলে। সেক্সপিয়ারের বিখ্যাত চরিত্র ওথেলো নিজের প্রেমিকাকে প্রচন্ডভাবে সন্দেহ করত। সেখান থেকে এই রোগের নামকরণ-ওথেলো সিনড্রোম বা সন্দেহবাতিক রোগ যা দাম্পত্য সম্পর্কে ভয়াবহ পরিণতি এনে দেয়। কিন্তু অধিকাংশ সময় দেখা যায় সন্দেহটি ভিত্তিহীন।
আত্ম-সন্দেহ থেকে দূরে থাকতে হলে নেতিবাচক চিন্তার পরিবর্তে ইতিবাচক চিন্তা করা এবং যেকোন বিষয়কেই ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করা। অফিসে কোন কাজে অকৃতকার্য হলে এই বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে না দেখে ইতিবাচকভাবে দেখা। কাজে ভুল হবে, বাধা আসবে, সমস্যা তৈরি হবে। আত্ম-সন্দেহ যতই প্রকট আকার ধারণ করুক না কেন, সবসময় নিজের কাজের প্রতি ইতিবাচক ভাবে মনোনিবেশ দিতে হবে। নিজের কাজ, কর্মক্ষেত্র নিয়ে এমন মানুষের সাথে কথা বলা, যারা অনুপ্রাণিত করবে। ইতিবাচক ভাবনা ভাবতে সাহায্য করবে। ইতিবাচক মানুষদের সাহচার্য যতটাই কাম্য নেতিবাচক মানুষদের থেকে নিজেকে ততটাই দূরে রাখতে হবে।
মানুষকে অহেতুক সন্দেহ করা, পেছনে লেগে থাকা নিন্দনীয় কাজ। পবিত্র কোরআনে দয়াবান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা বেশি অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না।(৪৯:১২)তাই অনুমান করে কাউকে আঘাত করা, তার মান-সম্মানের কথা না ভেবে প্রচার করা কোনো মুসলমানের কাজ নয়। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা মিথ্যাচারের শামিল, অনেক ক্ষেত্রে তা অপবাদের পর্যায়ে পড়ে যায়। অথচ কারো ওপর অপবাদ দেওয়ার শাস্তি ভয়াবহ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা সচ্চরিত্রবান সরলমনা মুমিন নারীদের ব্যভিচারের অপবাদ দেয়, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য পরকালে আছে মহাশাস্তি।’ (২৪ :২৩)
সর্তক ভাবে চলা আর সন্দেহ করা এক নয়। পারিবারিক জীবনে অথবা পেশাজীবনে অবশ্যই আমাদেরকে সর্তক হয়ে চলতে হবে। তবে সতর্কের মাত্রাটা যখন সন্দেহের দিকে চলে যায়, তখন পরিবেশ হয়ে উঠে বিষাধাগারে। মনে রাখতে হবে পৃথিবী পাল্টে গেছে ! কারোর মেধা-বুদ্ধি-ক্ষমতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নাই। সন্দেহবাতিক মনোভাব সব সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়। সন্দেহ প্রবণতাকে দূর করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ কর যায়। যেমন খোলামেলা আলোচনা করা, মিলে মিশে চলা। এতে মনের সন্দেহ নাকি তা সন্দেহবাতিক তা বোঝা যাবে এবং মনও হালকা হবে। সাধারণত: মানসিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তিরা অতীত নিয়ে পড়ে থাকে না বা অতীত নিয়ে চিন্তা করে বর্তমানকে ধ্বংস করে না। তারা বর্তমানকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে এবং বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সব সময় নিজেকে মানিয়ে নেয় এবং সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
জ্ঞানের উৎপত্তিই একগ্রতা। একগ্রতার অভাবে বর্তমানে দেশে বহু বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদদের মনোভাব সত্যের প্রতি, মানুষের প্রতি, ভবিতব্যের প্রতি মৌলিক বিশ্বাসটাই ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে দিন দিন। শুধু ভূরিভূরি বইপুস্তক পাঠ করে ভাল নাম্বার পেলে জ্ঞানী হয় না, কিছু জানা যায় বটে। মানুষ জ্ঞানের প্রতি অণুরাগ দেখিয়েছে এবং জ্ঞানের সাহায্যে গড়ে তুলেছে আধুনিক সভ্যতা। আর তাতেই এসেছে আধুনিকতা, নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সম্পদ ভান্ডার। আমরা জ্ঞান আহরনের প্রতি এতটাই উদাসীন যে, অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আমদের মাথায় ঘুরঘুর করে। এসব থেকে সহ সকলকেই সরে আসতে হবে। তবেই আর কোনো বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হবে না।
লেখক:উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি ও টেকসই উন্নয়নকর্মী