
জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। একটি দেশের উন্নয়ন দর্শন ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার রূপরেখা। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষা ও গবেষণা খাত এখনও তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকার পাচ্ছে। শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির প্রায় ১.৫ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ৪–৬ শতাংশ মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের জন্য একটি “নিরাপত্তা ও জ্ঞানভিত্তিক কল্যাণমুখী উন্নয়ন বাজেট” প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই বাজেটের মূল দর্শন হলো— “নিরাপত্তা, জ্ঞান ও মানবকল্যাণের সমন্বিত রূপান্তর”। এর মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করে একটি স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।
২০২৬–২০২৭ বাজেটের সামষ্টিক কাঠামো
মোট ব্যয়ের আকার: ৯,৫০,০০০ কোটি টাকা।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য মাত্রা: ৭,১০,০০০ কোটি টাকা। কর ফাঁকি রোধ, এনবিআরের আধুনিকায়ন ও সম্পূর্ণ অটোমেশনের মাধ্যমে অর্জিত হবে।
বাজেট ঘাটতি: ২,৪০,০০০ কোটি টাকা যা জিডিপির ৩.৪% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে, যাতে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি ঋণের প্রবাহ ঠিক থাকে।
মূল্য স্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য: ৭.০% যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি নিশ্চিত করবে।
রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির জন্য কর প্রশাসনের অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং করজাল সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাজেটের মূল লক্ষ্য সমূহ
জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতি: মুখস্থ বিদ্যার বাইরে গিয়ে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠন।
নিরাপদ ও সক্ষম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: আধুনিক ভূ-রাজনীতি ও সাইবার হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
মানব সম্পদ উন্নয়ন: দক্ষ ও বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী জনগোষ্ঠী তৈরি।
সামাজিক ও খাদ্য সুরক্ষা: প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ।
প্রযুক্তি নির্ভর জাতীয় রূপান্তর
প্রস্তাবিত উদ্যোগ
শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি: সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: টেকসই উন্নয়ন এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষা ও গবেষণা খাতে মোট বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব । এর মাধ্যমে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪–৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।
জাতীয় গবেষণা তহবিল: প্রথমবারের মতো মোট জিডিপির একটি বড় অংশ সরাসরি কৃষি-প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীলতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির মৌলিক গবেষণার জন্য ৫,০০০–১০,০০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ “জাতীয় গবেষণা তহবিল গঠন করা।
ইন্ডাস্ট্রি–অ্যাকাডেমিয়া সংযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমকে সরাসরি দেশীয় শিল্পের সাথে যুক্ত করে দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং আমদানিনির্ভরতা হ্রাস।
শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থী বান্ধব ঋণ: শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো ও আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের জামানতবিহীন ও নামমাত্র সুদে “শিক্ষা ঋণ” চালু করা।
উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি অবকাঠামো: বৈশ্বিক প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স,সাইবার নিরাপত্তা গবেষণাকেন্দ্র এবং বায়োটেকনোলজি ইনস্টিটিউট ও ইনোভেশন ল্যাব স্থাপন।
জাতীয় প্রতিরক্ষা ও সামরিক আধুনিকায়ন : জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে প্রতিরক্ষা খাতে মোট বাজেটের ৭% বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বাজেটকে অনুৎপাদনশীল খাত না রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে যুক্ত করে উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগে রূপান্তর করার ওপর কৌশল নেওয়া হয়েছে:
প্রস্তাবিত উদ্যোগ
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন: তিন বাহিনীর জন্য আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম,ড্রোন প্রযুক্তি,সাইবার প্রতিরক্ষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নজরদারি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।
দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প: সামরিক খাতের বরাদ্দ শুধু আমদানিতে ব্যয় না করে দেশের অভ্যন্তরে সমরাস্ত্র কারখানা ও ডকইয়ার্ড প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানো, যা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশীয় শিল্প বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বেসামরিক সেবা: সামরিক বাহিনীকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা,জলবায়ু অভিযোজন এবং জাতীয় কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা।যাতে সামরিক খাতের ব্যয় সরাসরি জনগণের কল্যাণে আসে।
কল্যাণমুখী বিশেষ সামাজিক পদক্ষেপ

সার্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা: নাগরিকদের চিকিৎসার পকেট খরচ কমাতে প্রাথমিক পর্যায়ে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য “কল্যাণ স্বাস্থ্য বিমা” চালু করা।
স্থায়ী ভোক্তা রেশন কার্ড: নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা।
বয়স্ক ভাতা: বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার সম্প্রসারণ
ব্যক্তি পর্যায়ে কর মুক্তআয়সীমা বৃদ্ধি: মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিতে ব্যক্তিপর্যায়ে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৪,০০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা।
অর্থ সংস্থানের কৌশল বা রাজস্ব বাড়ানোর উপায়
অনুৎপাদন শীল ব্যয় হ্রাস: কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত নতুন মেগা প্রকল্প স্থগিত রেখে চলমান উৎপাদনশীল প্রকল্প সম্পন্ন করা।
সম্পদকর ও বিলাসী পণ্যে শুল্ক: উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের ওপর সম্পদ কর পুনর্গঠন এবং বিলাসবহুল ভোগ্যপণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে সেই অর্থ শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে স্থানান্তর করা।
আর্থিক খাতের সুশাসন: ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা। বিগত বছরের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ বন্ধ করে সুশাসনে জোর দেওয়া।
কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর: ই-ট্যাক্স ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, করজাল বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ।
শর্তসাপেক্ষ কালো টাকা বিনিয়োগে উৎসাহ: উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের শর্তে সীমিত সুযোগ প্রদান।
এই প্রস্তাবিত বাজেট মূলত “মানবসম্পদ + প্রযুক্তি + নিরাপত্তা”—এই তিন স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো। একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে কল্যাণমুখী হয়ে ওঠে, যখন তার সীমান্ত থাকে সুরক্ষিত এবং তার নাগরিকরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মানসম্পন্ন শিক্ষা নিয়ে ও গবেষণায় দক্ষ হয়ে উঠে। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়া সম্ভব। বর্তমান বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণার ঘাটতি থাকলেও , এই কাঠামো বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ ২০৩৫–২০৪০ সালের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং টেকসই উন্নয়ন কর্মী
