ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এক নতুন বাংলাদেশের অপেক্ষায়

0
6

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র কয়েকদিন দিন বাকি। এই নির্বাচনকে ঘিরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোযোগ এখন মূলত নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের দিকে। তপশিলের পর থেকেই দেখা যায় সচিবালয়ের নিত্যকাজে ভাটা পড়ার দৃশ্য। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা । নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুধু রুটিন কাজ করে সময় পার করছেন। সবাই নতুন সরকারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে থাকায় এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় থাকায় রুটিন কাজের বাইরে বড় কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক তৎপরতা বর্তমানে অনেকটা সীমিত।

জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক কাজের গতি কমে যাওয়াকে নিয়মিত কাজের ব্যত্যয় হিসেবে দেখছেন জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টরা। কর্মকর্তারা এখন আগের সেই পুরোনো ধারায় বসে আছে। এটি আগামী সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। কারণ, সরকার নীতি গ্রহণ করে। আর তা বাস্তবায়ন করে আমলাতন্ত্র। সরকার যাবে, সরকার আসবে। কিন্তু প্রশাসনের নিয়মিত কাজকর্মের গতি একই রকম থাকবে, এটাই হওয়া উচিত। এর ব্যাতিক্রম হওয়া কাম্য নয়। যেটা আমাদের সামনে আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ পদ ধরে রাখতে আবার কেউ কেউ ভালো পদে বসতে এখন থেকেই সম্ভাব্য ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন ।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বিরাজ করছে চরম উত্তেজনা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় অত্যধিক চাপে, কঠিন পরিস্থিতির কারণে দিশেহারা হয়ে পড়ে । এক বছরে প্রায় হাজারের অধিক রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৬০ জন নিহত এবং আট হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দখল চাঁদাবাজি, গণপিটুনি এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি ‘রাজনৈতিক নতুন সূচনা’ হয়েছে। তবে বাস্তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণে নেতৃত্বের অভাবে এই সময়টিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সহিংসতা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। একদিকে রাজনৈতিক সংস্কারের স্বপ্ন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে।

একটি জাতির জীবনে নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং নতুন স্বপ্নে পথচলার সূচনা। ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে পুরোনো জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে এক নবতর রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা জোরালো হয়ে উঠেছে। এই “নতুন বাংলাদেশ” কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় পরিবর্তন নয়, বরং এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি এবং অধিকারের নতুন এক দিগন্ত। নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে একটি “নতুন বাংলাদেশ” গড়ার আকাঙ্ক্ষা কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির এক গভীর প্রতিফলন। একটি স্থিতিশীল এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন এখন প্রতিটি নাগরিকের চোখে।

বিগত সময়ের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তার চূড়ান্ত প্রতিফলন আমরা দেখতে চাই একটি সুসংহত শাসনব্যবস্থায়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে তরুণ প্রজন্ম একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে। এই নতুন বাংলাদেশে, মেরুদণ্ডহীন আমলাতন্ত্র বা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া বিচারব্যবস্থার কোনো স্থান হবে না ।

একটি নতুন বাংলাদেশের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত স্বচ্ছতা। যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতিই পারবে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে। নির্বাচন-পরবর্তী এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা হলো রাজনৈতিক সংস্কার। পেশিশক্তি এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে এখন প্রয়োজন:বহুমাত্রিক গণতন্ত্র: যেখানে প্রতিটি নাগরিকের ভোটের মূল্য থাকবে এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় থাকবে। তরুণদের অংশগ্রহণ: নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণদের সুযোগ করে দেওয়া।

নতুন বাংলাদেশের প্রধান স্তম্ভ হতে হবে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে এই “নতুনত্বের” স্বাদ ম্লান হয়ে পড়বে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিকাশ এই নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হতে পারে।দেশের প্রবৃদ্ধি যেন কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার মাধ্যমেই একটি সাম্যবাদী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের “নতুন” হয়ে ওঠে যখন তার বিচারব্যবস্থা স্বাধীন হয়। দলমত নির্বিশেষে অপরাধীর বিচার এবং সাধারণ মানুষের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনই হবে নতুন বাংলাদেশের মূল শক্তি।নতুন বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিকের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ভিন্নমতকে সম্মান জানানো এবং গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতাই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচয়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশের লুণ্ঠিত ভোটাধিকার এবং মৌলিক ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধারে নতুন বাংলাদেশ মানে কেবল একটি নতুন সংসদ ভবন বা নতুন কিছু মুখ নয়। এটি হলো একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে এবং দুর্নীতির কোনো ঠাঁই হবে না। ইতিহাসের চাকা ঘুরেছে, এখন সময় সামনের দিকে তাকানোর। যদি আমরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে পারি, তবেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। রক্ত দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতা এবং পরিবর্তনের অঙ্গীকার যেন কোনোভাবেই বিফল না হয়—এটাই আজকের প্রত্যাশা।যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা ছাড়া “স্মার্ট বাংলাদেশ” বা “নতুন বাংলাদেশ” গড়া অসম্ভব।

একটি দেশ তখনই বদলে যায় যখন তার নাগরিকরা সচেতন হয়। নির্বাচনের রায় কেবল সরকার গঠন করে না, বরং দেশের আগামীর ভাগ্য নির্ধারণ করে। আমাদের সকলের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টাই পারে এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে।

দীর্ঘদিনের নির্বাচনী অনাস্থা দূর করে দেশব্যাপী এক সত্যিকারের গণ-উৎসবের সূচনা হয়েছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবারের নির্বাচনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ নির্বাচন জনপ্রতিনিধির নির্বাচন নয়, বরং এটি দুঃশাসনের ধ্বংসস্তূপ থেকে জনআকাঙ্ক্ষার পুনর্জাগরণ,বাংলাদেশের সামগ্রিক পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার নির্বাচন । জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত আর ত্যাগের মহিমা ধরে রাখতে হলে,এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পরবর্তী কয়েক দশকের জন্য নিরাপদ করবে। এর ফলে মেধাবীদের রাজনীতিতে আসার পথ যেমন সুগম হবে, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

মানুষ এখন এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে ক্ষমতার কোনো একক কেন্দ্র থাকবে না। একজন প্রধানমন্ত্রী যেন স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারেন। দেশে কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশনায় না চলে,সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা। লুটপাটকারী শ্রেণি যেন আর গড়ে উঠতে না পারে। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস দূর করতে হবে। এ দেশের জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠ করে মানুষ তার প্রতিনিধি নিজে বেছে নিতে চায়।

বাংলাদেশের মানুষ আগামী ১২ তারিখে নতুন এক সকালের অপেক্ষায় আছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে সাধারণ মানুষ উদ্দীপ্ত। বাংলাদেশের মানুষ নতুন এক সূর্যের উদয় দেখবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও টেকসই উন্নয়ন কর্মী