অসহায় বাবা’রা

0
66

অসহায় বাবা’রা : 

বাবা ছিলেন বংশের বড় ছেলে, তার উপর আমার জন্মের আগে, আমার এক বোন মারা গিয়েছিলো, তাই বংশের বড় সন্তান বলেই আদর পেয়েছিলাম মাত্রাধিক, ঠোঁট ফুলিয়ে ফুলিয়ে কাঁদার আগে, আমাকে শান্ত করানোর জন্য চাচা-ফুফুদের ছোটাছুটি শুরু হতো ! বড় চাচ্চু বলতেন, আমার চোখের পানি দেখলে’ চাচ্চু নাকি সহ্য করতে পারেননা ! তা’ শুনে আমার আহ্লাদের মাত্রা’ আরো দ্বিগুন বেড়ে গিয়েছিলো !
প্রতি বছর জুনের ছয় তারিখে, দাদির বাড়িতে একদিনের জন্য যাওয়া হতো’ দাদার মৃত্যুবাষিকী পালন করার জন্য! পুরো গ্রামের লোকজন আর দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরা আসতেন এই মিলাদ মাহফিলে! এত ব্যস্ততার মধ্যেও, দাদি আমাকে ইশারায় ডেকে নিয়ে গ্লাস ভর্তি দুধের মালাই খাওয়াতে ভুলতেননা ! আমার দাদি আর চাচা-ফুফুরা আদর দিয়ে দিয়ে’ আমাকে মাথায় তুলেছিলেন ! আর তার সাথে সাথে’ আমাকে আরো বেশি spoil করেছিলেন আমার বিউটি খালা ! Ice cream আর Chocolate খেতে খেতে আমি বরাবরই এক নাদুস-নুদুস বাচ্চা ছিলাম ! দাদার বাড়ি আর নানার বাড়িতে’ আদরের ষোলো আনায় ছিল আমার দখলে !
মা ছিলেন খুবই strict, আমাদের বাসার নিয়ম নীতি’ ক্যাডেট কলেজের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলোনা, ঘড়ির কাটার সাথে রুটিন মিলিয়ে মিলিয়ে’ চলতে হতো ! আমাদের সকাল শুরু হতো ভোর পাঁচটায়, ঘুম থেকে উঠার পর, খালি পেটে এক গ্লাস পানি খাওয়া ছিল’ মায়ের কড়া নিয়ম ! এরপর, ৩০ মিনিট বাড়ির ছাদের উপর exercise করতে হতো, আমাদের বাড়ির ছাদটা ছিল খুব সুন্দর – চারপাশের টবে অনেক যত্নে বেড়ে উঠা’ মায়ের ফুল গাছ আর সবজি বাগান ! বাবা বলতেন, সকালের এই মিষ্টি পরিবেশে exercise করলে’ গায়ে নাকি নূরের হাওয়া লাগে, তাতে শরীরে অসুখ-বিসুখ কম হয় ! Exercise করে, shower নিয়ে, নামাজ পড়ে’ বাবার কাছে কোরানের সূরা’ অর্থ সহ মুখস্ত করতে হতো’ আরো ৪৫ মিনিট ! এরপর breakfast করে, সাতটা পনেরো মিনিটে বাবা নিজে drive করে, স্কুলে নামিয়ে দিতেন !
স্কুলের ছুটির পর, মা বাড়িতে নিয়ে এসে, class work এর’ খাতা check করতেন আর home work করাতেন ! খাতায় teacher এর লাল কালির দাগ পড়া মানে ছিল’ শাস্তি অনিবার্য ! বিকেল তিনটায় হাতের লেখা practice করতে হতো ! চারটায় হুজুর আসতেন আরবী পড়াতে ! সন্ধ্যার পর বাড়িতে জোরে কথা বলা যেত না ! পরিবেশটা এমন ছিল’ যাতে ছোট্ট একটা পিন পড়লে, পিনের শব্ধটা’ও যেন শোনা যায় !
এত নিয়মনীতির মধ্যেও’ বিউটি খালা আর বড় চাচ্চুর বদৌলতে, আমি নিয়ম ভেঙে’ দিব্যি কোনো না কোনো ভাবে পার পেয়ে যেতাম ! আর’ বাবা বাড়িতে থাকলে, আমাকে আর পায় কে…? পুরো বাড়িটা’ সেদিন আমার জন্য স্বর্গ !
কতদিন ভাত খাওয়ার পরও, বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি’ বাবার হাতের লোকমা খাওয়ার জন্য ! এক লোকমা মুখে নেয়ার পর’ যখন চলে যেতে চাইতাম, তখন বাবা বলতেন, “আর এক লোকমা খেতে হবে মা…!” কিছু না বলে, চুপচাপ হা’ করে পাশে দাঁড়িয়ে যেতাম ! কারণ বাবার হাতের লোকমা খাওয়ার মজা’ই ছিল আলাদা ! বড় হওয়ার পরও, কত রাত ঘুমের মধ্যে টের পেয়েছি’ বাবা চেম্বার থেকে ফিরে, আমার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে মা’কে বলেছেন, “আমার লক্ষী মেয়েটা কি ঘুমিয়ে গেলো ?” আদর পেয়ে পেয়ে, আমি ভীষণ আহ্লাদী হয়ে গিয়েছিলাম ! কাজের লোক-ড্রাইভার থেকে শুরু করে বাড়ির সবাই ভয়ে তটস্থ থাকত !
কত কি অদ্ভুত বায়না করে বসতাম ! স্কুলে ভর্তি হওয়ার দিন’ বাবাকে গিয়ে বললাম silver color গাড়ি ছাড়া স্কুলে যাবোনা, তার দুদিন পর’ বাবা আমাকে চেম্বারে ডেকে নিয়ে বললেন, “মা, নিচে গিয়ে দেখো একটা silver color গাড়ি আর ড্রাইভার তোমার জন্য অপেক্ষা করছে !” তিন তলার সিঁড়ি বেয়ে সেদিন কিভাবে যে নিচে নেমেছিলাম, আজও সে কথা মনে আছে ! বড্ড আহ্লাদী ছিলাম, একবার যা বলতাম, আগে হোক’ আর পরে হোক, বাবা সেই আশা পূরণ করতেন ! আহ্লাদে আহ্লাদে এইভাবেই বাবার রাজ্যে আমি বরাবরই রাজত্ব করেছিলাম !
আমার গল্প শুনে কি মনে হচ্ছে, আমি বাবা-মার একমাত্র সন্তান ? আসলে তা’ না…আমার আরো ভাই-বোন আছে ! বাবা এইভাবেই’ সবার কোনো না কোনো আবদার পূরণ করতেন !
সন্তান একটা হোক আর পাঁচটা হোক’ বাবা-মা ধনী হোক আর দিনমজুর হোক, সব বাবা-মার কাছে সন্তান সবসময়’ই আদরের ! সব বাবাদের কাছে মেয়েরা ‘রাজকন্যা’ আর ছেলেরা’ রাজপুত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় ! পৃথিবীর সব বাবারা’ই আদর করে করে’ ছেলেমেয়েদের মাথায় তুলে রাখে ! অনেক স্বপ্ন নিয়ে’ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিজের শখ আহ্ললাদ বিসজ্জন দিয়ে’ তিল তিল করে, এক একটা সন্তানকে অনেক যত্ন করে বড় করে !
এরপর… একসময়, আদরের ছেলেটা বড় হয়ে চাকরি-বাকরি আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায় নিজস্ব গন্ডিমায় ! আর মেয়েটা’কে বিয়ে দিতে হয় সামাজিকতার কারণে ! তারপর, বাবার সেই’ আহ্লাদী মেয়েটাকে তাল মিলাতে হয় অসম তালে ! বার বার হোঁচট খেয়ে পরে, সংসারের দায়-দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে ! অনেকদিনের সহজ সরল অভ্যেস গুলো ছেড়ে, নতুন পরিবেশে এসে, সে আস্থা খোঁজে ! চারদিকে ঘিরে থাকা চাকচিক্যে’ থাকে কিছু শূন্যতা, কিছু অপূণ্যতা, কিছু শাসন আর বাঁধনের পরিসীমা !
তারপরেও’ একগাল হাসি দিয়ে বলে, “এইতো বাবা ! বেশ ভালো আছি, কদিন পরেই তোমাদের দেখতে আসবো !”
বোকা মেয়ে ! বাবারা সবই বুঝে’ তুই কেমন আছিস ! মুখে না বললেও, তোর কষ্টগুলো নীরবে বাবারা বুঝে নেয়…! বুঝে নেয়- ‘সময়’ তোকে পরিয়ে দিয়েছে সামাজিকতার শিখল ! তোর নীরব কান্নাও শুনতে পায় ! তবুও, অসহায় বাবারা’ সমাজের ভয়ে কিছু বলতে পারেনা, ইচ্ছে হলেও তোকে ফিরিয়ে নিতে পারেনা ! সমাজ আছে, লোকে কি বলবে ?
এরপর…, আস্তে আস্তে করে, একসময়’ নিস্তেজ হয়ে যায় এই বাবা’রা ! কখনো বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে, কখনো অকালে’ বুকের ব্যথাটা একদিন বড্ড বেড়ে যায়, ভিতরের জমে থাকা কষ্টগুলো গলা চেপে ধরে, শ্বাস বন্ধ হয়ে’ নীরবে চলে যায়’ ওপারে… !
তারপরে’ও যুগ যুগ ধরে বাবারা এই ভাবে’ই অসহায় হয়ে, চোখের জল লুকিয়ে’ কন্যা দান করেন ! আদর করেন সন্তানদের…! স্বপ্ন দেখেন – দিনের অবসরে’ সন্তান’রা কিছুটা সময় হলেও’ পাশে এসে বলবে…, ভালো আছো বাবা ? কেমন ছিল আজকের দিনটা ? চলোনা কাল ছুটির দিনে কোথাও গিয়ে বেরিয়ে আসি !
আবার, যেসব বাবা’রা চলে গেছেন, তারাও অপেক্ষা করেন’ দুনিয়াতে রেখে যাওয়া সন্তানদের কাছ থেকে, একটু দো’আ !
অথচ, বেশিরভাগ সন্তানদের সময় হয়না…! কাজের অজুহাতে, অতি ব্যস্ত সন্তান’রা ভুলে যায় বাবার অবদান…! দায়-দায়িত্ব এড়িয়ে, ব্যস্ত হয়ে পড়ে’ বাবার bank balance আর সম্পদ ভাগাভাগি নিয়ে…!
যেখানেই থাকুক, সব বাবারা যেন ভালো থাকেন, সব বাবাদের জন্য শুভ কামনা…!!!
Maryland, June 18th

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here