পরমাণু বিদ্যুৎ : আমাদের রায় ভাষান্তর : শোয়েব করিম

0
1684

অনুবাদ প্রসঙ্গে: পাবনার ঈশ্বরদীতে রুপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন হয় ২০১৩ সালে । ২০১৬ সালে চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে এর প্রথম ধাপের কাজ সমাপ্ত হলো । অথচ বিনা তর্কে এবং বিনা প্রতিবাদে পরমাণু  বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা নজিরবিহীন ঘটনা। বাংলাদেশে হয়তো তাই হতে চলেছে। এর কারণ হিসেবে যেকোন জাতীয় ইস্যুতে আমাদের সাধারণ উদাসীনতাকে পুরোপুরি দায়ী করবার আগে আমাদের স্বীকার করতে হবে এই বিষয়ে সার্বিক ধারণা দিতে সক্ষম লিফলেট, বুকলেট কিংবা পত্রিকার মন্তব্য প্রতিবেদন এমনকি ফেসবুক পোস্টের অভাবটাকেও। একটি দুটি লেখা সবার কাছেই পৌছবে তেমন আশা অবান্তর, তাই এধরনের প্রচুর টেক্সট সকল মাধ্যমেই সামনে আসা প্রয়োজন। এছাড়াও সুনির্দিষ্টভাবে রুপপুর বিষয়ক আলোচনা আমাদের যেমন প্রয়োজন, পরমাণু বিদ্যুৎকে সার্বিকভাবে আমাদের বোঝা প্রয়োজন; কারণ রুপপুরই বাংলাদেশের একমাত্র এবং সর্বশেষ প্রস্তাবিত পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়।

আমেরিকা বা ইউরোপে যেখানে পরমাণু বিদ্যুৎ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে কথা বলবার মত বিশেষজ্ঞের অভাব নেই সেখানেও লোকে যাতে এর প্রাথমিক ধারণাটা পেতে পারেন তার জন্য বহু চটিপুস্তিকা বা প্যামফ্লেট ছাপা হয়। বর্তমান লেখাটি তেমনি একটি প্যামফ্লেট ‘Dirty, Dangerous, Expensive : Our Virdict is in on Nuclear Power Plant’ এর অনুবাদ। এটি ছাপায় এবং বিলি করে ‘বিয়ন্ড নিউক্লিয়ার’ নামের একটি পরমাণু বিদ্যুৎ বিরোধী সংগঠন।

একটা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থানের প্রথম কারণ এর অপরিমেয় ঝুঁকি। একটা নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর হিরোশিমায় ফেলা এটম বোমার ১০০০ গুণ তেজস্ক্রিয়তা ধারণ করে। ছোটখাটো কোন ভুল বা দুর্ঘটনায় নিউক্লিয়ার ফিশন কার্যকর থাকাকালীন এই তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার মানেই হল একটা বিরাট গণহত্যা সাধিত হওয়া – অন্যান্য গণহত্যার মত যা মুহূর্তে কিংবা একটি স্বল্প সময় জুড়ে ঘটবেনা, শত বছর ধরে চলতে থাকে এই মৃত্যু পরম্পরা। আর জন্ম নেবে নিশ্চিতভাবেই বহু বিকলাঙ্গ, বিকৃত দৈহিক আকৃতির শিশু এবং বহুকালের জন্য আবাসের এবং আবাদের অনুপোযোগী হয়ে পড়বে একটি বিস্তীর্ণ ভূভাগ। কোটি মানুষের জীবন, জীবনের পরম্পরা এবং একটা বিস্তীর্ণ ভূভাগকে এতবড় ঝুঁকির মুখে ফেলে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র, নীতিগতভবেই মানুষ এর বিরোধিতা করবে সেটাই স্বাভাবিক। অবশ্য এই ঝুঁকি ছাড়াও বহাল তবিয়তে একটা নিউক্লিয়ার পাওয়ার পান্টের টিকে থাকারও আছে বিবিধ ঝুঁকি এবং ক্ষতি। আর ইতোমধ্যেই বহু বিদেশি ঋণের জালে আটকে পড়া বাংলাদেশি হিসেবে অত্যন্ত আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে খেয়াল করা প্রয়োজন এই গোটা কর্মযজ্ঞই সাধিত এবং পরিচালিত হবে বিপুল পরিমাণ রাশিয়ান ঋণে, যা শুধু বহুদিন ধরে পরিশোধ করতে হবে তা নয়, এই ঋণের পরিমাণ বাড়বে দিনের পর দিন।

আমাদের প্রত্যেকের তাই প্রতি পর্যায়ে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ছড়ানো বিষক্রিয়ার কথা, এর ঝুঁকি এবং বিপদের কথা এবং এর বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের কথা বিশদভাবেই জানা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এই লেখাটি আমাদের প্রাথমিক ধারণাটুকু দিতে পারে। আর তাই অত্যন্ত সহজ ভাবে লেখা এই প্যাম্ফলেটটি বেছে নেয়া হয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে সহজে স্পষ্ট ধারণা পাবার সুবিধার্থে কিছু পারিভাষিক শব্দ বা আপাত দুর্বোধ্য বিষয়কে ভেঙ্গে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে উহ্য রাখা ব্যাপারগুলোও উল্লেখিত হয়েছে। রুপপুর বিষয়ক কিছু প্রাসংগিক তথ্যও সংযুক্ত হয়েছে অনুদিত লেখাটির ফাঁকে ফাঁকে।

পরমাণু বিদ্যুতের বিষক্রিয়া

পরমাণু বিদ্যুতের জ্বালানি : নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরে জ্বালানী হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হয়। জ্বালানি ব্যবহার প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটি পর্যায়ে এই ইউরেনিয়াম তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন করে- প্রথমত খনি থেকে উত্তোলনের সময়, অতঃপর ইউরেনিয়ামের কারখানায় যেখানে স্তুপের পর স্তুপ অবক্ষেপ ফেলে আসা হয় এবং অবশেষে রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ, সমৃদ্ধকরণ এবং ফেব্রিকেশন বা ব্যবহারোপযোগী ইউরেনিয়াম রড তৈরির সময়। কয়লা বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটায়, এনিয়ে মানুষ যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। কিন্তু ইউরেনিয়াম জ্বালানির উৎপাদনও গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপন্ন করে। বস্তুত খনি থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলন ও এর প্রক্রিয়াকরণ সর্বাধিক কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গতকারী শিল্পগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাংশে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় র‌্যাডন গ্যাস ভেসে বেড়ায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে, আটলান্টিক পেরিয়ে আরো বহুদূর। নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরগুলিতে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন নামের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অত্যাধিক তাপ এবং তেজস্ক্রিয়তা উৎপন্নের মাধ্যমে টারবাইন ঘোরানোর কাজে (যার গতিশক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রুপান্তর করা হয়)।

কিছুদিন পরপর পুরাতন ইউরেনিয়াম জ্বালানির রডগুলি বদলে নতুন রড দিতে হয় রিয়েক্টরে। ব্যবহৃত পরিত্যক্ত ইউরেনিয়াম রডগুলি রিয়েক্টর ভবনের ভেতরে বা পাশ্ববর্তী অন্য ভবনে একটি জলপূর্ণ চৌবাচ্চায় রাখা হয়। কয়েকবছর পর ঐ রডগুলোকে ভবনগুলোর বাইরে, স্টিল লাইন্ড কংক্রিট নির্মিত সুবৃহৎ পিপায় রাখা হয়, অস্তিত্বহীন কোন স্থায়ী ভাগাড়গামী জাহাজের অপেক্ষায়। যেহেতু পৃথিবীর কোথাও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলবার কোন ভাগাড় নেই, তাই নিউক্লয়ার ইন্ডাস্ট্রি এগুলোকে সাধারণত পুনঃর্ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করে। রডগুলো কাটা হয়, এসিডে ডুবিয়ে রাখা হয় এবং পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করা হয় যাতে প্লুটোনিয়াম এবং ইউরেনিয়ামের অবশিষ্টাংশ বের করে নেয়া সম্ভব হয়।

তেজস্ক্রিয়তার পর্যায়ক্রমিক নিঃসরণ : তেজষ্ক্রিয়তার বিষ ছড়াবার জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলোর ধ্বংসই হতে হবে এমন কোন কথা নেই। নিয়মিত কার্যক্রমের সময় এই পাওয়ার প্লান্টগুলো তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিঃসরণ করে পরিবেশে এবং যে নদী, লেক বা সাগর রিয়েক্টর শীতলীকরণের জল যোগায়, তাতে। (রুপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে যেমন জল জোগাবে পদ্মা নদী) এই পর্যায়ক্রমিক নিঃসরণ ছাড়া একটা রিয়েক্টর চালু রাখা অসম্ভব। ট্রাইটিয়াম (তেজস্ক্রিয় হাইড্রোজেন) তেজস্ক্রিয় ক্রিপটন এবং জেনন গ্যাস যেগুলোর কিছু কিছু তেজস্ক্রিয় স্ট্রনটিয়াম এবং সিজিয়ামে রূপান্তরিত হয় এগুলোসহ সব রকমের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিশোধনের পরিমিত ব্যয় সাপেক্ষ কোন প্রযুক্তি নেই।

অপরিমেয় তেজস্ক্রিয়তা : তেজস্ক্রিয়তার যে নির্দিষ্ট মাত্রা সনাক্ত করার জন্য তেজস্ক্রিয়তা সনাক্তকরণ-যন্ত্র বসানো হয়, তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা যখন বর্জ্যপানিতে সেইমাত্রা থেকে কম থাকে, নিউক্লিয়ার প্লান্ট থেকে তখনই তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিষ্কাশন করা হয়। মার্কিন সরকার তেজষ্ক্রিয়তার এই মাত্রাকে সহনীয় বলে অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু এই সহনীয় মানেই যে নিরাপদ তা কিন্তু নয়। এর “নিম্নে যতটুক পর্যন্ত গ্রহণ করা যায়” – তার মানে সর্বনিম্ন যতটা সহনীয় বলে নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রি দাবী করে ঠিক ততটাই।

একটা নিউক্লিয়ার প্লান্টের তেজস্ক্রিয়তা নিঃসরণের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য Nuclear Regulatory Commission নির্ভর  করে প্লান্ট মালিকদের নিজস্ব প্রতিবেদন এবং কম্পিউটারে আঁকা গ্রাফিক চিত্রের উপর। পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্যের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশ আগে থেকেই অনুমান করা যায়- আর তাই এটা ভার্চুয়াল, বাস্তবিক নয়। আর তাই কেউ আসলে জানেনা ঠিক কতটা তেজস্ক্রিয়তার নিঃসরণ ঘটছে। কঠিন, বায়বীয় এবং তরল তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ছে কাছে এবং দূরে।

যে ডাস্টের কোন বিন নেই : জ্বলে যাওয়া পরিত্যক্ত ইউরেনিয়াম রড (যেগুলো উচ্চ মাত্রায় তেজস্ক্রিয় হিসেবে গণ্য করা হয়) ফেলবার মত কোন স্থায়ী ভাগাড় নেই এবং কখনো থাকবেও না। তথাকথিত ‘স্বল্প মাত্রায় তেজষ্ক্রিয়’ বর্জ্য যেমন তেজস্ক্রিয় ক্লেদ, নিঃসৃত বায়ু এবং প্লান্টে ব্যবহৃত জলপরিশোধক, পাইপ, পাম্প এবং অন্যান্য এমন সব যন্ত্রপাতি, অকার্যকর হয়ে গেলে যেসব বদলে নিতে হয় সেসব ফেলবারও আদতে কোন জায়গা নেই। এই সব ‘স্বল্প মাত্রায় তেজস্ক্রিয়’ বর্জ্যও এত উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয় যে এগুলোকে রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

মৃত্যুপরম্পরা : তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কেবল যখন উৎপন্ন হয় তখনকার জন্যই নয় বরং চিরকালের জন্যই বিপদজনক। সব ধরনের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপই যেকোন মাত্রার তাপে, চাপে এবং রাসায়নিক পরিবেশে একটা নির্দিষ্ট হারে তেজস্ক্রিয় রশ্মি এবং তেজস্ক্রিয় পরমাণুর নিঃসরণ ঘটায়, যতক্ষণ না তা ভিন্নকোন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপে বা স্থির অপরিবর্তনশীল আইসোটোপে রূপান্তরিত হয়। কিছুই তেজস্ক্রিয় নিঃসরণের সেই সুনির্দিষ্ট হারে তারতম্য ঘটাতে পারেনা বা সেটাকে বন্ধ করতে পারেনা। যে মেয়াদ অতিক্রম করলে একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের অর্ধাংশের তেজস্ক্রিয়তা থেমে যায় তার দশগুণ বেশি সময়জুড়ে তা পরিমাপযোগ্য তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়। (একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের অর্ধাংশের তেজস্ক্রিয়তার মেয়াদ অর্ধেকটা পেরিয়ে গেলে, সেটার তেজস্ক্রিয়তা অর্ধেকটা কমে যায়, এবং অবশিষ্ট মেয়াদের ২ ভাগের একভাগ পেরিয়ে গেলে তেজস্ক্রিয়তা তিন-চতুর্থাংশ কমে যায়, কিন্তু ঐ মেয়াদের এক-দশমাংশেও কিছু তেজস্ক্রিয়তা রয়ে যায়)। এর মানে প্লুটোনিয়াম-২৩৯ এর মত কিছু তেজস্ক্রিয়-আইসোটোপের অর্ধাংশ তার ২৪০০০ বছরকার আয়ু নিয়ে আধুনিক মানুষ যতদিন ধরে এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছে তার চাইতেও আরো দীর্ঘসময়ের জন্য বিপদজনক রয়ে যাবে।

ঝুঁকি এবং বিপদ

দুর্ঘটনা : এমআইটি প্রকাশিত একটি নিবন্ধ একটা দুর্ভাগ্যজনক সত্য তুলে ধরেছে- “একটা প্লান্টের এবং এর যন্ত্রপাতির ডিজাইন থেকে শুরু করে এর প্রস্তুতকরণ, নির্মাণ এবং স্থাপনে এর পরীক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং ব্যবস্থাপনার প্রত্যেকটি স্তরে এর সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ভর করে মানবিক প্রভাবক এবং দক্ষতার উপর।”  (“Human Error in Nuclear Power Plants,” Technology Review, Feb.1980, p.28)

হাজার হাজার পাম্প, ভাল্ব, মোটর আর সুদীর্ঘ সব সার্কিট নিয়ে প্রত্যেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট অত্যন্ত জটিল। আর তাই মানবিক ভুল, ডিজাইনের ত্রুটি এবং যন্ত্রাংশের ঠিকঠাক কাজ না দেয়া অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। “নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের ব্যবস্থা, কাঠামো, যন্ত্রপাতি, কর্মসূচি এবং জনবল সবকিছুই ব্যর্থতা এবং ভুলের শক্তিশালী উৎস। সমস্যা দেখা দিতে পারে ডিজাইনের, প্রস্তুতকরণের, স্থাপনের, নির্মাণের ভুলে, পরীক্ষা- নিরীক্ষা, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি থেকে, বিস্ফোরণ এবং আগুনের ফলে, মাত্রাতিরিক্ত ক্ষয়, কম্পন, চাপ, তাপ, শীতলতা, তেজষ্ক্রিয় বিপর্যয় এবং অন্যন্য ভৌত অনুঘটকের কারণে, যন্ত্রপাতির পুরনো হয়ে যাওয়ার ভঙ্গুরতা থেকে, এবং বাহ্যিক বিভিন্ন প্রভাবক যেমন বন্যা, ভূমিকম্প, টর্নেডো, এবং ষড়যন্ত্রের কারণে।” (Daniel F. Ford: Three Mile Island,1982, p.29)

যাদের প্লান্টের অতীতের সমস্যা মোকাবেলার গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা আছে তারা সহ বহু অভিজ্ঞ কর্মীরা যেহেতু অবসর নিয়েছেন বা অবসর গ্রহনের কাছাকাছি বয়সে পৌঁছে গেছেন তাই এই ইন্ডাষ্ট্রি একটা বড় ধরনের যোগ্য লোকবল সংকটের সম্মুখীন। একটা সাধারণ রিয়েক্টর কমপক্ষে ১০০০ হিরোশিমা বোমার তেজস্ক্রিয়তা ধারণ করে। যেকোন দুর্ঘটনাই তাই বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর ফলে প্রলয়ঙ্কারী হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও অত উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট হাতিয়ার সমৃদ্ধ ও যথেষ্ট প্রশিক্ষিত ত্রাণকর্মী সহ জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা খুব কম দেশেরই আছে। তেজস্ক্রিয়তার শিকার মানুষের চিকিৎসার জন্য পৃথক হাসপাতালের অভাব রয়েছে সেই সব দেশে। আর একটা বিপুল পরিমাণ আতংকিত জনতাকে খুব সহজেই অকুস্থল থেকে সরিয়ে আনার চিন্তাটাও অত্যন্ত অবাস্তব। দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় দূষণের কারণে নিজেদের ঘরবাড়ি এবং সমাজ ছেড়ে আসা মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসন সমস্যার সমাধান জরুরি অবস্থা মোকাবেলার কোন পরিকল্পনাতেই নেই।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি : স্থুলানুতে পরিণত করা  তেজস্ক্রিয়তা, কোষ, টিস্যু এবং ডিএনএ বিনষ্টকরণের ঝুঁকি বাড়ায় যা তেজস্ক্রিয়তার স্বভাব অনুযায়ীই মিউটেশন, ক্যান্সার, জন্মগত বিকলাঙ্গতা ও অন্যান্য জন্মগত সমস্যা এবং প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ব্যাধি, বক্ষ ও অন্তস্রাবী ব্যাধির কারণ। অত্যাধিক পরিমাণে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয়  হাইড্রোজেন এবং কার্বন সারা শরীরের প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং চর্বির সাথে মিশে যেতে পারে। বেড়ে ওঠার সময় দ্রুত এবং বিপুল কোষ বিভাজনের কারণে ভ্রুণ এবং শিশুরাই বিশেষত তেজস্ক্রিয়তার সহজ শিকার হয়ে ওঠে।

ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের BEIR VII প্রতিবেদন অনুযায়ী তেজস্ক্রিয়তার কোন মাত্রাই নিরাপদ নয়। (“Health Risks from Exposure to Low Levels of Ionizing Radiation,” 2005)

কার্যক্ষেত্রের ঝুঁকি : নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রি সেইসব কর্মীদের উপর নির্ভরশীল সাধারণ জনগণের তুলনায় যাদের জন্য অনেক বেশি মাত্রায় তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হওয়াটাও অনুমোদিত। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে বেশকিছু পুরনো হয়ে যাওয়া যন্ত্র এমনকি কেবল মরচেও উচ্চ ও তীক্ষ্ম গামা রশ্মি নির্গত করে। গতিরুদ্ধ বা ফুটো হয়ে যাওয়া পাইপ যখন মেরামত করতে হয় বা বদলে নিতে হয় তখন ছোটখাটো মেরামতের সময়ও সারা বছরে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তা একজন শ্রমিকের জন্য অনুমোদিত সেই পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হতে পারেন তিনি কয়েক মুহূর্তেই।

সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসী হামলা : একটা সাধারণ বাণিজ্যিক রিয়েক্টর বছরে যে পরিমাণ প্লুটোনিয়াম উৎপন্ন করে তা অন্তত চল্লিশটা এটম বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট। জ্বলে যাওয়া পরিত্যক্ত তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম রড পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হলে তা থেকে উৎকলিত প্লুটোনিয়ামকে নিউক্লিয়ার বোমায় রূপান্তর করা যায়। বাকি তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো সাধারণ বিস্ফোরকের সাথে মিশিয়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে সক্ষম ‘বিষক্রিয় বোমা’ তৈরি করা যায়। প্রত্যেকটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রই সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু, আঘাতটা আসতে পারে স্থলপথ, নৌপথ, আকাশপথে অথবা যারা সেখানে কাজ করে বা যাদের সেখানে প্রবেশের অনুমোদন রয়েছে তাদের কাছ থেকেও। সন্ত্রাসীরা আঘাত হানতে পারে রিয়েক্টরে, জ্বালানী সংরক্ষণের চৌবাচ্চায় অথবা অন্যান্য স্পর্শকাতর যন্ত্রাংশে, বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার নিঃসরণ ঘটিয়ে। আমেরিকান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলোর একটারও অবকাঠামো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কোন জাম্বো বিমানের আঘাতে টিকে থাকবার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়নি।

তেজষ্ক্রিয় রাজপথ, রেলপথ এবং প্রতিবেশ : কোথাও যদিও পরিত্যক্ত ইউরেনিয়াম রডগুলো ফেলবার স্থায়ী ব্যবস্থাও করা হয়, ট্রেনে, ট্রাকে বা ফেরিতে করে সেই বর্জ্যরে পরিবহন অসংখ্য জনপদকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। যদি আমেরিকার পশ্চিমের কোন রাজ্যের কোন জায়গা এর জন্য বাছাই করা হয় তবে পরিবহনের ক্ষেত্রে সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে যেহেতু আমেরিকার ১০৪ টি রিয়েক্টরের ৭৭ টিরই অবস্থান মিসিসিপির নদীর পূর্বদিকে। দুর্ঘটনা, সন্ত্রাসী হামলা অথবা পরমাণু বিদ্যুতের যন্ত্রানুসঙ্গ চুরি যাওয়া, যে কোন কিছুই এক্ষেত্রে ঘটা সম্ভব।

পরমাণু বিদ্যুতের ব্যয়সাপেক্ষতা

অর্থনৈতিক বোঝা : ব্যাপক সরকারি ভর্তুকি ছাড়া পরমাণু বিদ্যুৎ বাজার অর্থনীতিতে টিকে থাকতে পারতোনা। নির্মাণ, তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য সমস্যার সমাধানের খোঁজসহ গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য ঋণ নিশ্চয়তাও আমেরিকার কেন্দ্রীয় সরকারের ভর্তুকিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। একটি বড় বিপর্যয়ের সময়, প্রাইস-এন্ডারসন এ্যাক্ট অনুযায়ী  নিউক্লিয়ার ইন্ড্রাস্ট্রিকে জানমালের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রথম ১০ বিলিয়ন ডলার দিতে হয় যা ছিল তাদের মোট দায়মূল্যের ভগ্নাংশ মাত্র এবং যার বাকি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের আয়কর দাতাদেরই নির্বাহ করতে হয়। ১৯৮২ সালের নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশন CRAC2 রিপোর্ট অনুযায়ী পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশে জনসংখ্যার ঘনত্ব সাপেক্ষে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩১৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে যা আজকের হিসেবে ট্রিলিয়ান ডলারের কাছাকাছি। [রুপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যেই বসবাস করে ৩০ লাখ মানুষ ]

যুক্তরাষ্ট্রে যদি একটা নতুন রিয়েক্টর নির্মাণ করতে হয় তবে অবশ্যই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে রাজ্য নিয়ন্ত্রকদের রাজী থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার এমন ছাড় না দিলে, বেসরকারি বিনিয়োগকারীগণ একেকটা নতুন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণে বিনিয়োগ করতেন না।

[আমাদের রুপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেশিয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীগণ বিনিয়োগ করছেন না, সম্পূর্ণটাই হবে রাশিয়ান ঋণে, রাশিয়ান পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি ‘রোস্যাটম’ এর কারিগরি তত্বাবধানে এবং সহায়তায়। সুতরাং আসলের পাশাপাশি সুদটাও মাথায় রাখতে হবে। এই আসলের পরিমাণ নির্মাণ এর ক্ষেত্রে ১২.৬৫ বিলিয়ন, চল্লিশ বছরে আনুমানিক ২৬ বার রিফুয়েলিং ও মেরামতে প্রতিবার খরচ হবে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার, এবং চল্লিশ বছর ধরে প্রতিবছর এর পরিচালন ব্যয় আসবে প্রায় পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার। সুদের পরিমাণ ১.৫ শতাংশ যা ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এবং চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেবারও কোন বাধ্যবাধকতা রাশিয়ার বা রোস্যাটমের নেই। উল্টো কাজের মাঝ পর্যায়ে যদি কোন দুর্ঘটনায়ও কাজ বন্ধ হয়ে যায় তাহলেও পুরো প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণের অর্থ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে। লক্ষ্য করুন ‘বরাদ্দকৃত’ শব্দটা ব্যবহার করতে হচ্ছে আমাদের ‘তখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ঋণ’ বা “বিনিয়োজিত অর্থ”র কথা কিন্তু বলা যাচ্ছে না কারণ চুক্তিতেই তেমনটা বলা হয়নি।- তথ্যসূত্র Ruppur Nuclear power plant: Bangladeshs potential blackhole: A Rahman/ The Daily Star ]

নির্মাণ ব্যয় : পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র অত্যন্ত জটিল এবং বিপদজনক বলে এর নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি; দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ স্বাভাবিক। অনুমোদিত ‘নিউক্লিয়ার গ্রেড’ যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান খুব কম বলে, দেশি বা বিদেশি দালালদের কাছ থেকে নিম্নমানের বা কাজ চালানোর মত যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হয় যা রিয়েক্টর বিপর্যয়ের বিপদ বাড়ায়। [যেভাবে রাশিয়া আমাদের সরবরাহ করছে ভিভিইআর-১০০০ মডেলের সামান্য মডিফাইড ভার্সন, যা ভারতের কুদানকুলামের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্থাপন করতে গেলে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের বিরোধীতার মুখে সম্ভব হয়নি]

পরিচালন ব্যয় : শুরুর দিন থেকেই পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তেজষ্ক্রিয়তায় দূষিত হয়ে যায়। পুরো অবকাঠামোর বড় এবং ছোট যন্ত্রাংশগুলো “গরম” হয়ে যায়। আর তাই এর পরিচালন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এবং রিয়েক্টরগুলির বয়স বাড়ার সাথে সাথে এগুলো আরো বেশি তেজষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং পরিচালন ব্যয় আরো ঊর্ধ্বমুখি হয়। অকেজো, পুরোনো এবং ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ মেরামত বা পুনঃস্থাপনের সময় শ্রমিকদের প্রয়োজন হয় প্রতিরক্ষার, তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষাকারী পোষাকের, নজরদারিযন্ত্রের, কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের। কয়লা বা গ্যাস চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাইতে অথবা সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের চাইতে একটা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের যেকোন মেরামতের কাজে অনেক বেশি শ্রমিক, সময় এবং অর্থের প্রয়োজন পড়ে। উচ্চমানের ইউরেনিয়ামের যখন অভাব দেখা দেয় তখন জ্বালানী হিসেবে এর ব্যবহারের ব্যয় আরো অনেক বেশি বেড়ে যায়।

চিরস্থায়ী ব্যয় : একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট অপসারণও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যেহেতু তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলবার কোন ভাগাড় নেই তাই ঐ তেজষ্ক্রিয় অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতী সেখানেই বহু বছরের জন্য পড়ে থাকবে। বিপদজনক বলে নিশ্চিতভাবেই পরিবেশ নিরীক্ষক এবং সশস্ত্র রক্ষকেরও প্রয়োজন পড়বে।

(পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪০ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর বন্ধ হয়ে যাবে রুপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র)

শোয়েব করিম: লেখক ও অনুবাদক।

balokergaan@yahoo.com