বাংলার বৈশাখ – হাফিজ রহমান

0
985

পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক উৎসব। ঐতিহ্যগতভাবে সব ধর্মের মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু, বৈশাখ বর্তমানে যেভাবে পালিত হয় সেটি কতটা বাঙালির বৈশাখ সেটি প্রশ্ন সাপেক্ষ। সম্রাট আকবর প্রবর্তিত বাংলা সন নানা সংস্কারের হাত ধরে বর্তমান রূপ পেয়েছে। আকবরের বাংলা (মোগল), ব্রিটিশের বাংলা, পাকিস্তানির বাংলা এবং বাঙালির বাংলার মধ্যে বৈশাখ উদ্যাপনের বহু রকমের রয়েছে। তবে বর্তমান নিবন্ধের মূল আলোচনা বর্তমান বাংলার বৈশাখ নিয়ে।

আগে গ্রামে-গঞ্জে বৈশাখী মেলা বসত, বিভিন্ন আঙ্গিকের গ্রামীণ অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হত। লাঠিখেলা, বলি, ঘোড়া দৌড়, পতুল নাচ, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, কবিগানের আসর প্রভৃতি গ্রামীণ আবহের গ্রাম্য অনুষ্ঠানই মূলত ছিল বৈশাখের অনুষ্ঠান। বৈশাখী মেলা ছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গার্হস্থ্য মানুষের আনন্দময় বাৎসরিক কেনাকাটার স্থল। কিন্তু, বর্তমান সময়ে দেখা যায়, বৈশাখ আর গ্রামীণবৃত্তে আবদ্ধ নাই। রাষ্ট্রের অন্যান্য বিষয়ের মতো বৈশাখও এখন শহরমুখী। গ্রামীণ মেলা ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে শহুরে নাগরিক বৈশাখ ক্রমশ কলেবরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত, বাংলার বৈশাখ রূপ নিচ্ছে শহুরে কর্পোরেট বৈশাখে। সামাজিক উৎসবের এই কর্পোরেট রূপ যেকোন জনগোষ্ঠী জন্য চিন্তার বিষয়। শহুরে কর্পোরেট বৈশাখে জাকজমক-চাকচিক্য-লোকসমাগম আরো অনেক কিছুই থাকে, শুধু প্রাণ থাকে না, বাঙালিত্ব ধুকপুক করে।

বিভাগীয় শহরগুলোই বাংলাদেশ নয়। বাঙালির প্রাণস্পন্দন এখনো বেঁচে আছে শহুরে নিয়ন আলোর বাইরে। গ্রামীণ মেলা কিংবা উৎসবগুলো ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের কারণে। কেননা, রাজনৈতিক ক্ষমতাই বাংলার মানুষকে শক্তিশালী করে তুলেছে। পেশীশক্তি এবং মেলার বখরার সমীকরণ বর্তমান খুবই সহজ। মেলায় খুনখারাবি সাধারণ ঘটনা, নারীর প্রতি যৌন হেনস্তাও নৈমিত্তিক ঘটনা। এভাবে চলতে চলতে গ্রামীণ মেলায় সাধারণের উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে কমে গিয়েছে। অনেক বিখ্যাত মেলাগুলো আর ঠিকমত জমে না। মেলা জমাতে মেলা কমিটির লোকজন জীবন্ত মানুষের নোংরা, অশ্লীল এবং কুরুচিপূর্ণ নগ্ন নৃত্যকে পুতুলনাচ নাম দিয়ে মেলার মূল আকর্ষণে পরিণত করে। জুয়ার এবং নেশার আসরের কথা না হয় মুলতুবিই রইল।

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের নাগরিক উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত মূলত ছিল; পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মূলক সন্ত্রাসী কর্মকা-ের প্রতিবাদ স্বরূপ। যেটি ‘ছায়ানট’ বর্ষবরণের মধ্য দিয়ে ১৯৬৭ সাল থেকে সূচনা করে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ খি. সর্বপ্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রবর্তিত হয় (রমনার বটমূলে জাতীয় উৎসবে, নওয়াজেশ আহমদ, দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল, ২০০৮)। মঙ্গল শোভাযাত্রা ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে প্রতিবাদের কাতারে দাঁড়ানের জন্য। তৎকালীন নাগরিক সমাজ বৈশাখকে জাতীয়তাবদী দৃষ্টিকোণ থেকে অপশাসনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। কিন্তু, বর্তমানে নাগরিক বৈশাখের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য বাদ দিলেও বাঙালিত্ব কতখানি রক্ষিত হয় তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। বৈশাখ এখন আড়ম্বরে পরিণত হয়েছে কিংবা বলা যায় একদিনের দেখানোপনায় পর্যবসিত হয়েছে।

বৈশাখী মেলার জনপ্রিয় একটি গানের অংশবিশেষ: ‘মেলায় যাইরে মেলায় যাইরে, বখাটে ছেলের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাইরে…..’ এই গান কতটুকু রুচি সম্মত আর কতটুকু আইনসঙ্গত সেটিও ভেবে দেখবার বিষয়। বখাটেপনা রাষ্ট্রীয় এবং নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে দোষণীয়। গত বছর ব্যাপক হারে ঢাকা শহরে নারীদের প্রতি যৌন হেনস্তা হয়। রাষ্ট্রের স্পষ্ট করা দরকার এই যৌন হেনস্তার কারণ কী শুধুই বখাটেপনা নাকি আরো সুদূর কোন উদ্দেশ্যে। বৈশাখী মেলায় আগে নানা শব্দে নানা সুরে কিংবা বেসুরে বাঁশী বাজত কিন্তু এখন নগরের মেলায় বা রাস্তায় ভুভুজেলার অত্যাচার। কান ফাটানো মেশিনগানের শব্দের আফ্রিকান ভুভুজেলা। যে কারো কানের কাছে বিকট শব্দে বাজানোর অঘোষিত লাইসেন্স দেয়া আছে, এই ভুভুজেলা বখাটেপনাকে নতুনমাত্রা দিয়েছে। পান্তা-ইলিশ খাওয়াটাও উন্মাদনার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এক ঘোষণায় কয়েক লক্ষ মা ইলিশ ও জাটকা ইলিশ রক্ষা পেয়েছে। পান্তা ইলিশ খেয়ে সেজে গুজে একদিনের বাঙালি হয়ে উঠি। বাঙালি সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করাই যেখানে স্মার্টের লক্ষণ; সেখানে কেনই বা একদিনের বাঙালি হয়ে উঠা? মেলার আর একটি দিক যেটি না বললেই নয়, সামাজিক উৎসবে সাম্প্রদায়িকতার রঙ একটু একটু করে লাগা শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে ইসলামিস্টগণ যেমন দায়ী তেমনি দায়ী সেকুল্যারকুলও।

নাগরিক সমাজ বাঙালি চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না, যদি না গ্রামীণ সমাজ যুক্ত হয়। কেননা, শহুরে লোকজন আন্তরিকতা শূন্যভাবে আড়ম্বরে অনুষ্ঠান করে কিন্তু গ্রামীণ সমাজে হয়ত আড়ম্বর নাই কিন্তু আন্তরিকতার কোন অভাব থাকে না। সেজন্য রাষ্ট্রকে শুধু শহুরে অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক হলে চলবে না, মূল পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে কঠোর নজরদারি সহকারে গ্রামীণ অনুষ্ঠানগুলোতেও। সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো যাতে অন্যতম অসাম্প্রদায়িক সামাজিক অনুষ্ঠানকে ধ্বংস করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা সমস্ত শ্রেণির দায়িত্বশীল ব্যক্তির কর্তব্য।

অনেক শব্দে পহেলা বৈশাখের বর্তমান অবনমনকৃত রূপটির কতিপয় দিক আলোচনা করা হলো। তাহলে প্রশ্নজাগে বৈশাখী উৎসব বা মেলা কেমন হওয়া দরকারÑ কীভাবে হলে বাঙালি চেতনা সমুজ্জ্বল থাকে। বৈশাখ একান্তভাবে বাঙালি জাতিসত্তার অনুষ্ঠান; সেজন্য যে সব অনুকরণে বা পালনে বাঙালিত্ব হুমকির মুখে পড়ে তা থেকে বৈশাখ মুক্ত রাখা। হোক না একদিন কিন্তু সেটি যেন একান্ত বাঙালির দিন হয়, একান্ত বাঙালি উৎসব হয়।

লেখক: প্রভাষক, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম।