জয় হোক বাংলার, মাটি ও মানুষের…

0
870

জয় হোক বাংলার, মাটি মানুষের

সৈকত মজুমদার

সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সকল নাগরিকই নিজেদের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখছে যার যার মত। বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের ছোবল থেকে আজ মুক্ত দেশ। বাড়ছে মানুষের আয়ুবৃদ্ধির হার, কমছে শিশুমৃত্যুর হার। প্রতি বছর অধিক পরিমানে শিশু শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে, পাচ্ছে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক। নারীর ক্ষমতায়ন ঘটছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। দীর্ঘ বছর পর যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত হল তৈরি হল আজকের বাংলাদেশে। এতে প্রত্যেক নাগরিক তার অধিকার নিয়ে বাঁচার পথ সুগম হয়েছে।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এ দিনে বিজয় আসে, স্বাধীন হয় একটা দেশ। পৃথিবীর মানচিত্রে পতাকা উড়ে, নতুন আরেকটি; লাল সবুজের। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের পরাজিত করে বীর বাঙালি। পুরনো ছবিগুলো দেখলেই যে কেউরেই উত্তেজনা ভর করবে গায়ে-স্বাধীন দেশে ভাঙা জীপ গাড়িতে করে, কেউ পায়ে হেঁটে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে ঢুকছে ‘জয় বাংলা’ সেøাগানে সেøাগানে। কেউ খুশির কান্নায় জড়িয়ে ধরছে সহযোদ্ধাকে, কেউ বন্দুকের বুলেট ছুঁড়ে মারছে আকাশে। আর তাদের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বসেরা প্রশিক্ষিত সেনা সদস্যরা। ৩০ লাখ প্রাণ আর ৩ লাখ নারীর সম্ভ্র¢মের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা, এ বিজয়। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বদেশ।

সেই বিজয় আজ ৪৪ বছর পূর্ণের দুয়ারে। স্কুলে স্কুলে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে পতপত করে উড়া জাতীয় পতাকার সামনে শিশু গাইবে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’! বিজয়ের দেয়ালিকায় আনাড়ি হাতে থাকবে যুদ্ধের জয়গাঁথা, রঙতুলির আঁচড়ে থাকবে যুদ্ধজয়ে ফিরে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধার টানটান করা বক্ষ, উঁচিয়ে রাখা মুষ্টিবদ্ধ হাত। কিন্তু সে শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ কি গড়ে তুলতে পেরেছি আমরা গত চার দশক ধরে? যে নারীর হাতেখড়িতে তারা আগামীর পথচলার প্রথম পাঠ নেয়, আমরা কি পারছি তার জন্য বৈষম্যহীন উদার একটা সমাজ গড়তে? স্কুলের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় শিশুর ক্যানভাসে উঠে আসা ‘ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি’ কি আদৌ হাসছে কৃষক ফসলের মাঠে?

রাজনীতি নানা উত্থান-পতনে একে একে বিদায় নিলেন স্বাধীনতার কারিগররা, বিজয়ের স্বপ্নদ্রষ্টারা- মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন, জেনারেল আতাউল গনি উসমানী, মেজর জিয়াউর রহমান। কেউ স্বাভাবিকভাবে, কেউ অস্বাভাবিকভাবে। যুদ্ধপীড়িত দেশে প্রশাসনিক দূর্বলতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারে নেমে আসলো দূর্ভিক্ষ, দিকে দিকে মরলো আবার বাংলার মানুষ। ৭৫-এর কালো স্মৃতি জেঁকে বসলো সেই সাথে দেশের মানচিত্রে। সাম্য, ন্যায় বিচার, সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে যে বিজয় এসেছিল তা যেন মিথ্যাবাদী রাখালের কন্ঠে মিলিয়ে গেল অচিরেই। শস্যে শ্যামলা সবুজে উজালা এ মাটির বুকে নেমে এল দুঃশাসনের ভারী পাথর। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুলি শুনিয়ে একে একে ক্ষমতার আসন নেয়া সব পক্ষই এ দেশটারে বানিয়েছে দাবার বোর্ড, গুটি চালাচালিতে নিজেদের পকেটই ভারী করেছে শুধু। তা না হলে কেন ১৫ বছর যায় লেগে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের মত দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ শেষ করতে, কেন স্বাধীনতার ৪০ বছর পর এসে বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষার যুগেও ফ্লাইওভার বানাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় ডজন সংখ্যক মানুষ মারা যায়। কেন তেজ কমে আসা প্রমত্তা পদ্মা-মেঘনার বুকে লঞ্চডুবিতে হাজারো লাশ ভেসে যায় এখনো, কেন তাজরীন-রানা প্লাজার মত ঘটনায় হাজারো শ্রমিক আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়, বিল্ডিঙ্গের নিচে চাপা পড়ে তাদের স্বপ্ন!

দেশি বিদেশি নানা ধরনের পরিসংখ্যনে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রিয় ব্যাংকের রিজার্ভ অতীতের রেকর্ড ভেঙ্গে গেছে, জিডিপির হার বাড়ছে প্রতিবছর। কিন্তু গত ৪৩ বছর ধরে সরকারগুলো উন্নয়নের নামে শুধু অবকাঠামো তৈরির নমুনা দেখিয়ে মানুষকে মিছে স্বপ্ন দেখিয়েছে। বাড়েনি জীবন জীবিকার মান। নদী ধ্বংসের সাথে সাথে বিলীন হচ্ছে জনপদ থেকে জনপদ। মানুষ ছুটছে শহরের অলিতে গলিতে, বস্তিতে, ফুটপাতে ন্যুনতম বাঁচার আশায়। অথচ নদীমাতৃক এ দেশে মানুষের সুখের অভাব ছিল না, কারো সম্পদের অভাব থাকলেও ছিল না কর্মের অভাব, জীবিকা আহরণের অভাব। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর উর্বর মাটিকে সবগুলো শাসকগোষ্ঠীই জোর করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল করার প্রাণপন চেষ্টায় লিপ্ত আছে। প্রকৃতি এখানকার মানুষকে জীবিকার জন্য যে নিজস্ব পদ্ধতি ঠিক করে দিয়েছে, সেটিকে দিনকে দিন নষ্ট করছে সবাই। যে শস্যের ভারে দেশ কানায় কানায় পুরে যেত, সে শস্যই এখন অনেক সময় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় আমাদের। পাট আর আখচাষতো বলতে গেলে হারিয়েই গেল। যে মাটিতে কোন ধরনের কৃত্রিম প্রক্রিয়া ছাড়াই বছরে একাধিকবার ফসল ফলিয়ে কৃষক যে পরিমাণ শস্য পেত, সে মাটিতে এখন যাবতীয় আধুনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেও ফলানো শস্য নিয়ে সন্তুষ্ট নয় কৃষক। কৃষিপ্রধান দেশে প্রতিটি ইউনিয়ন জুড়েই থাকার কথা ফসল সংরক্ষণের হিমাগার, সেটা আমরা গত ৪৩ বছরেও গড়তে ব্যর্থ হয়েছি। অথচ এই কৃষক জনতাই সবচেয়ে বেশি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশমাতৃকার অসম্মানের বিরুদ্ধে। দেশের সবখাতে গুরুত্বের সাথে অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। কিন্তু সময় ও চাহিদাগুণে কোনটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ তার কোন মাপকাঠি কেউ অনুসরণ করছে না। কৃষকের শস্য, মৎস্যচাষীর মাছ রাখার পর্যাপ্ত হিমাগার না গড়ে আমরা বেশি মনোযোগ দিই ক্রিকেট টুর্নামেন্ট উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে কত বেশি টাকা খরচ করা যায় সেদিকে। যার কারণে জাতিসংঘের নানা লক্ষ্যমাত্রা পূরনে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নাম প্রশংসিত হলেও, নানা স্বীকৃতি ও পুরস্কারে ধন্য হলেও বিশ্বমিডিয়ায় শিরোনাম হয় বাংলাদেশের মানুষ সমুদ্রপথে সুখের সন্ধানে অবৈধপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ ছাড়ছে।

দেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে না, তা নয় কিন্তু। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম কিন্তু বেশ উজ্জ্বলই বলতে গেলে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সকল নাগরিকই নিজেদের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখছে যার যার মত। বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের ছোবল থেকে আজ মুক্ত দেশ। বাড়ছে মানুষের আয়ুবৃদ্ধির হার, কমছে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার। প্রতি বছর অধিক পরিমানে শিশু শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে, পাচ্ছে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক। নারীর ক্ষমতায়ন ঘটছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। দীর্ঘ বছর পর যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত তৈরি হল আজকের বাংলাদেশে। এতে প্রত্যেক নাগরিক তার অধিকার নিয়ে বাঁচার পথ সুগম হয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা ন্যায়ের সমাজ গঠনের, সবার জন্য যাতে সমভাবে বিচার সংস্কৃতির উদয় হয়। তা না হলে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির নামে যে কলঙ্কমুক্ত সমাজের কথা আমরা বলছি বিশ্ববাসীর কাছে তা যে হাস্যকর হয়ে উঠবে! মত-দল-আদর্শ নির্বিশেষে দেশের সকল গোষ্ঠীকেই দেশগড়ার সমান সুযোগ না দিলে, পিছিয়ে পড়বে দেশ। স্বদেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে দেশগড়াতে তাদের সাথে থাকতে হবে আমাদেরও। সম্মিলিত প্রয়াসেই পারি আমরা এগিয়ে যেতে।

গত চার দশকে উন্নয়ন হয়েছে চোখে পড়ার মত, তবে যে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর আমাদের পরে স্বাধীন হয়ে উন্নতির যে শিখরে পৌঁছেছে, আমরা হয়ত ততদূর পারিনি। আমাদের যতটুকু উন্নয়ন তা সাধারণ মানুষেরই অবদান, যা কিছু পিছিয়ে পড়া তার জন্য দায়ী বিভক্তির রাজনীতি। এ সাধারণ মানুষের ঘামেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিজয় মাস আসার প্রাক্কালেই একটি সুখবর চয়ন করেই শেষ করব – দেশে নদীদূষণ ও ভরাটের কারণে মাছের উৎপাদন বেশ কমে গিয়েছিল। গ্রামের সাধারণ কৃষক ও জেলেরা পুকুর ও ঘেরে মাছের উন্নত জাত চাষের মাধ্যমে গত ১০ বছরে দেশের মাছের উৎপাদন দ্বিগুণ করেছেন। বাঙালিও মাছের স্বাদ আবারও ফিরে পেতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ এখন মাছ চাষে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, ১০ বছর ধরে চাষের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে। ২ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন মিষ্টি পানির মাছ উৎপাদন করে শীর্ষে রয়েছে চীন। এর পরেই আছে ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ। অথচ ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ অতীতের ওই সুখস্মৃতি একসময় ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল। গত এক যুগে উন্নত জাতের চাষ বাঙালির সঙ্গে মাছের সখ্যকে আবারও ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে। আর তা সম্ভব হয়েছে দেশের মৎস্যবিজ্ঞানী ও চাষিদের সম্মিলিত চেষ্টায়।

সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা। শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই একাত্তরের সকল আত্মত্যাগের প্রতি। জয় হোক বাংলার, মাটি ও মানুষের।

সৈকত মজুমদার : ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিটিস।

প্রকাশ দখিনা ৩৮