২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতন ও গণহত্যার পর প্রায় লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এ গণহত্যার অষ্টম বর্ষপূর্তিতে সংকট সমাধানের কোনো কার্যকর রূপরেখা না দিয়ে মিয়ানমার জান্তা নতুন করে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে। ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ব্যাপক আকার ধারণ করে। হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, সম্পদ লুট ও বসতভিটা ধ্বংসের মাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগের দফায় বাস্তুচ্যুতদের সঙ্গে মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখেরও বেশি।
আট বছর পরও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং রাখাইনে নতুন করে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জাতিসংঘ ২০২৫ সালে সতর্ক করে বলেছিল, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য বেসামরিক মানুষ মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে।এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু একটি মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একই সঙ্গে একটি গণহত্যা, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
১. ২০১৭সালেরঘটনা: গণহত্যারপটভূমি
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন ARSA-এর হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিরাপত্তা অভিযান শুরু করে। মিয়ানমার সরকার দাবি করে, এটি ছিল সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। কিন্তু জাতিসংঘের বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসে যে, সামরিক অভিযানের ধরন ছিল ব্যাপক, সংগঠিত ও বেসামরিক রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রাথমিক তদন্তে রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস, হত্যা, ধর্ষণ ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তে এসব কর্মকাণ্ডকে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে জাতিসংঘের মিয়ানমারের উপর আর্ন্তজাতিক স্বতন্দ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনআরও বিস্তৃত তদন্ত করে। ২০১৯ সালের চূড়ান্ত অনুসন্ধানে মিশনটি যুক্তিসঙ্গত ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে মিয়ানমার রাষ্ট্রের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করার গণহত্যামূলক অভিপ্রায় অনুমান করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।মিশন আরও বলেছিল, মিয়ানমারে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা তখনও গণহত্যার গুরুতর ঝুঁকিতে ছিল এবং তাদের জন্য প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিরাপদ ও টেকসই ছিল না।
২. মিয়ানমারের মিথ্যাচার ও ঐতিহাসিক অপপ্রচারের ধরন: রোহিঙ্গাসংকটেমিয়ানমারেররাষ্ট্রীয়বক্তব্যকয়েকটিমূলদাবিরওপরদাঁড়িয়েআছে।
- জাতিগত পরিচয় অস্বীকার: মিয়ানমার সরকার সম্প্রতি রোহিঙ্গাকুলকে ‘বাঙালি’ বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের ঐতিহাসিক জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।
- নিরাপত্তার ভুয়া আশ্বাস: রাখাইন রাজ্যের বর্তমান গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর সংঘাত গোপন রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করতে মিথ্যা স্থিতিশীলতার দাবি করা হচ্ছে।
- “এটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ছিল”: মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ২০১৭ সালের অভিযান ARSA-এর হামলার প্রতিক্রিয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।কিন্তু জাতিসংঘের তদন্তে দেখা যায়, অভিযান শুধু সশস্ত্র ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও উচ্ছেদের শিকার হন। গ্রাম ধ্বংসের ধরনও ছিল ব্যাপক ও সংগঠিত।
- “রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসী”: মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজস্ব একটি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে না। বরং তাদের প্রায়ই বাঙ্গালী হিসেবে অভিহিত করে, যার মাধ্যমে তাদের মিয়ানমারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী নয়, বাংলাদেশ থেকে আগত অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়। এই রাষ্ট্রীয় বক্তব্য রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার অস্বীকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
- “গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত নয়”: মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আদালতের মামলাতেও গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং গণহত্যার উদ্দেশ্য থাকার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে আন্তর্জাতিক আদালত ২০২০ সালে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা থেকে সুরক্ষার অধিকারকে অন্তর্বর্তী পর্যায়ে ‘plausible’ বলে বিবেচনা করে মিয়ানমারকে গণহত্যা প্রতিরোধে একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।তবে আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশ এবং জাতিসংঘের অনুসন্ধান মিয়ানমারের সম্পূর্ণ অস্বীকৃতিকে অত্যন্ত দুর্বল করে দিয়েছে।
- “সংখ্যা কমিয়ে দেখানো ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার প্রস্তুত”: বাংলাদেশে থাকা নিবন্ধিত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে তোয়াক্কা না করে মিয়ানমার মাত্র ৩ লাখ মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়ার অবাস্তব প্রস্তাব পেশ করেছে। মিয়ানমার বারবার প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেও বাস্তবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিবেশ তৈরি হয়নি।২০২৬ সালের আগস্টে মিয়ানমার বাংলাদেশে থাকা প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে বলে জানিয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে প্রত্যাবাসনের কথা বলেছে। তবে এটি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার স্বীকার করা বা ব্যাপক প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা নয়।
২. বিচারওজবাবদিহিতা
- ২০১৭ সালে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে মিয়ানমার বাহিনীর অপরাধ মূলক মানসিকতা দমন করতে হবে।
- দীর্ঘ মেয়াদে কেবল বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভবনয়। মিয়ানমারের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জনমত গঠন করে নিজ ভূমিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই এই মহাসংকটের এক মাত্র টেকসই সমাধান।
৩. আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থান: রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি এখন শুধু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যাগণহত্যাকনভেনশন-এর অধীনে মামলা করে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ICJ মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, সামরিক বাহিনী ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন গোষ্ঠীগুলোকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা এবং সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়।এই আদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার প্রশ্নকে আইনি বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে নিয়ে যায়।আন্তর্জাতিকঅপরাধআদালতের বাংলাদেশ/মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত মূলত রোহিঙ্গাদের ব্যাপক নির্বাসন, নিপীড়ন এবং বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ICC প্রসিকিউটর মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রথম গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করেন এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।ফলে রোহিঙ্গা সংকটে ভবিষ্যৎ জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পথ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে।
৪. আট বছর পর বাস্তবতা: বাংলাদেশ মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এই মানবিক দায়িত্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত মূল্য ক্রমেই বাড়ছে।কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, জ্বালানি, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
২০২৫-২৬ সালের Joint Response Plan-এ জাতিসংঘ ও অংশীদাররা রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য ৯৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আবেদন করেছিল। ২০২৬ সালে পুনর্গঠিত পরিকল্পনায় ১.৬ মিলিয়ন মানুষকে সহায়তা দিতে ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
৫. বাংলাদেশের করণীয়:প্রত্যাবাসনকে একমাত্র টেকসই সমাধান হিসেবে ধরে রেখে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান হওয়া উচিত—রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে একীভূত করা নয়, বরং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।তবে “যেকোনো মূল্যে প্রত্যাবাসন” গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ অনিরাপদ পরিবেশে প্রত্যাবাসন হলে রোহিঙ্গারা আবারও নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হতে পারে।
- মিয়ানমারের ‘বাঙালি’ ও মিথ্যা সংখ্যার দাবির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলা।
- আসিয়ান, ওআইসি ও জাতিসংঘের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় রূপরেখা তৈরি।
- রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ দমন ও মাদক-অস্ত্র চোরাচালান বন্ধে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো।
- নতুন করে কোনো অনুপ্রবেশ যেন না ঘটে সে লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা।* দাতাসংস্থাগুলোর কাছে তহবিল ঘাটতি মিটাতে যৌথ তহবিল আবেদন পুনরুজ্জীবিত করা।
৫.২ প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত নির্ধারণ ও টেকসই সমাধান: ১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে রোহিঙ্গাকুলকে নিজ দেশে পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান না করা পর্যন্ত প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। বাংলাদেশকে মিয়ানমারের কাছে স্পষ্টভাবে কয়েকটি শর্ত তুলে ধরতে হবে:
- রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা;
- চলাচলের স্বাধীনতা;
- নাগরিকত্ব বা কার্যকর আইনগত মর্যাদা;
- সম্পত্তি ও বসতভিটার অধিকার;
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ;
- বৈষম্যহীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার;
- আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি;
- প্রত্যাবাসনের পর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা।
৫.৩ আন্তর্জাতিক আদালতের প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা: বাংলাদেশকে ICJ ও ICC-এর কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় তথ্য, সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণ সরবরাহে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।বিশেষ করে শরণার্থী শিবিরে সংগৃহীত সাক্ষ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, ছবি, ভিডিও, চিকিৎসা-নথি এবং স্যাটেলাইট তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় তথ্য ভান্ডার প্রতিষ্ঠাকরা।
৫.৪ আন্তর্জাতিক তহবিল নিশ্চিত করা: বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আরও জোরালোভাবে বলতে হবে। কারন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের সৃষ্টি নয়; তাই এর আর্থিক বোঝাও বাংলাদেশের একার দায়িত্ব হতে পারে না।বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, উপসাগরীয় দেশ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
৫.৫ আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার: শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, উখিয়া-টেকনাফসহ ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও উন্নয়ন কর্মসূচি বাড়াতে হবে। রাস্তা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পানি, বিদ্যুৎ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানে বিশেষ বিনিয়োগ প্রয়োজন।
৬. আন্তর্জাতিকসম্প্রদায়েরকরণীয়
৬.১ মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ: শুধু বিবৃতি সেমিনার দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানীদল অতীতেও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছিল।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মিয়ানমারের ওপর লক্ষ্যভিত্তিককার্যকর চাপনিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা:
- মিয়ানমার জান্তা ও আরাকান আর্মির উপর অস্ত্র সরবরাহ বন্ধসহঅর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।
- আন্তর্জাতিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা;
- সামরিক নেতৃত্বের সম্পদ জব্দ; সামরিক বাহিনীর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা।
- রাখাইন রাজ্যে একটি জাতিসংঘ সমর্থিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গঠন নিশ্চিত করা।
- সংঘাতরত সব পক্ষকে বেসামরিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা বন্ধে বাধ্য করা।
- খাদ্য ও শিক্ষা সহায়তার বৈশ্বিক বরাদ্দ কর্তন বন্ধ করে পুনর্বাসন ও মানবিক সাহায্য বৃদ্ধি করা।
৬.২ ASEAN-এর সক্রিয় ভূমিকা
আঞ্চলিক সংস্থা ASEAN-এর উচিত মানবিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগকে শক্তিশালী করা।রাখাইনে মানবিক সহায়তা, বেসামরিক সুরক্ষা এবং প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে ASEAN-এর একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও মধ্যস্থতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা ।
৬.৩ আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নির্যাতন, নির্বাসন ও নিপীড়নের জন্য দায়ীদের বিচারICJও ICC-তে চলমান বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ICC তদন্তে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য দেশের ইউনিভার্সালজুরিসডিকশনব্যবস্থাও ব্যবহার করা।
৬.৪ মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা
আন্তর্জাতিক তহবিলের ঘাটতি রোহিঙ্গা সংকটকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং পানি-স্যানিটেশনসহ মৌলিক মানবিক সহায়তা বন্ধ বা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হলে শিবিরগুলোতে অপরাধ, পাচার, চরমপন্থা ও অনিয়মিত সমুদ্রযাত্রা বাড়তে পারে।
৭. রোহিঙ্গাদের বক্তব্যকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে আনতে হবে
রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাদের বাদ দিয়ে নেওয়া উচিত নয়।জাতিসংঘের ২০২৫ সালের একটি পরামর্শমূলক প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নিজেদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মতামত নথিবদ্ধ করা হয়েছে।রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবিগুলো হওয়া উচিত:
নিরাপত্তা + নাগরিকত্ব + অধিকার + ন্যায়বিচার + মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।শুধু ভৌগোলিক প্রত্যাবাসন যথেষ্ট নয়; অধিকারহীন অবস্থায় ফিরে যাওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
৮. “মিথ্যাচারবনামতথ্য”: বাংলাদেশেরকূটনৈতিককৌশল হিসাবেমিয়ানমারেরপ্রচারণারজবাবআবেগদিয়েনয়প্রমাণদিয়েদিতেহবে।বাংলাদেশেরউচিতআন্তর্জাতিকপর্যায়েএকটিসমন্বিততথ্যভান্ডারগড়েতোলা, যেখানেথাকবে:
১. ২০১৭সালেরহামলাওউচ্ছেদেরনথি;
২. প্রত্যক্ষদর্শীরসাক্ষ্য;
৩. ধ্বংসহওয়াগ্রামেরস্যাটেলাইটছবি;
৪. হত্যাওধর্ষণেরচিকিৎসা-নথি;
৫. আন্তর্জাতিকতদন্তেরপ্রতিবেদন;
৬. প্রত্যাবাসন-সংক্রান্তমিয়ানমারেরপ্রতিশ্রুতিওবাস্তবায়নেরতুলনামূলকতথ্য;
৭. রোহিঙ্গাদেরনাগরিকত্বওঅধিকারবঞ্চনারনথি;
৮. নতুনকরেরাখাইনেসংঘটিতমানবাধিকারলঙ্ঘনেরতথ্য।
এরমাধ্যমে “রোহিঙ্গারাবাংলাদেশথেকেযাওয়াঅবৈধঅভিবাসী”—এইমিয়ানমারীয়বয়ানেরবিরুদ্ধেতথ্যভিত্তিকআন্তর্জাতিকজনমততৈরিকরাসম্ভব।
৯. প্রত্যাবাসনের নতুন রোডম্যাপ
বাংলাদেশের উচিত একটি “নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতকরণের কর্মপরিকল্পনা” প্রস্তাব করা।এই রোডম্যাপের পাঁচটি ধাপ হতে পারে:
প্রথম ধাপ: বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ যাচাইয়ের পাশাপাশি জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ।
দ্বিতীয় ধাপ:প্রত্যাবাসন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ।
তৃতীয় ধাপ: রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব/আইনগত মর্যাদা, চলাচল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা।
চতুর্থ ধাপ: সম্পত্তি পুনর্বহাল
ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর ও সম্পত্তির অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ।
পঞ্চম ধাপ: প্রত্যাবাসন-পরবর্তী আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণপ্রত্যাবাসনের পর অন্তত কয়েক বছর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা।
১০. বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য কূটনৈতিক জোট
বাংলাদেশকে শুধু দ্বিপাক্ষিক বাংলাদেশ-মিয়ানমার কাঠামোর মধ্যে আটকে না থেকে বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে সক্রিয় হতে হবে।অর্থাৎ জাতিসংঘ;OIC;ASEAN;ইউরোপীয় ইউনিয়ন;যুক্তরাষ্ট্র;যুক্তরাজ্য;কানাডা;কানাডা;জাপান;অস্ট্রেলিয়া;ভারত;চীন;উপসাগরীয় দেশসমূহ।মিয়ানমারেরসাথে চীন ও ভারতেরঅর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব থাকার কারনে এই দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১১. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ববোধ
আট বছর ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের মানবিক দায়িত্ববোধের প্রমাণ। কিন্তু এই দায়িত্বকে অনন্তকাল ধরে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তিনটি বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, একটি বাদ দিয়ে অন্য দুটি সফল করা সম্ভব নয়।
প্রথমত—মানবিক সহায়তা;
দ্বিতীয়ত—জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার;
তৃতীয়ত—নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন।
পরিশেষে, রোহিঙ্গা সংকটের অষ্টম বর্ষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আর কত বছর বিশ্ব এই সংকটকে শুধু “মানবিক সংকট” হিসেবে দেখবে? ২০১৭ সালের পর আট বছর পেরিয়ে গেছে। জাতিসংঘের তদন্তে গণহত্যামূলক অভিপ্রায়ের বিষয়ে গুরুতর অনুসন্ধান উঠে এসেছে; ICJ রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার জন্য মিয়ানমারকে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে; ICC-তে মিয়ানমার-বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত চলছে।তবুও রোহিঙ্গারা তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদে ফিরতে পারেনি।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত—মানবিকতা থাকবে, কিন্তু অনির্দিষ্টকালের দায়ভার নয়; প্রত্যাবাসনের দাবি থাকবে, কিন্তু অধিকার বিসর্জন দিয়ে নয়; মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপ থাকবে, কিন্তু মিথ্যাচার ও দায়মুক্তি মেনে নয়।আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বার্তাটি আরও স্পষ্ট:
রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার না হলে গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হবে। আর নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অধিকারভিত্তিক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের অবসান হবে না। তাই, অষ্টম বর্ষে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু “রোহিঙ্গাদের বাঁচিয়ে রাখা” নয়—তাদের ন্যায়বিচার, নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও নিজ ভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের অধিকার নিশ্চিত করা।
সংক্ষিপ্তনীতিগতসুপারিশ
১. ICJ ও ICC-এর বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সক্রিয় সহযোগিতা বৃদ্ধি।
২. মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ওপর লক্ষ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার।
৩.আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বৃদ্ধি।
৪.রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারকে প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত করা।
৫.প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের কার্যকর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
৬.রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী—উভয়ের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বৃদ্ধি।
৭.মিয়ানমারের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক আন্তর্জাতিক তথ্যকৌশল গ্রহণ।
৮.ASEAN, OIC, চীন ও ভারতের সঙ্গে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ।
৯. প্রত্যাবাসনের পরও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখা।
১০.“নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণওটেকসইপ্রত্যাবাসননিশ্চিতকরণেরকর্মপরিকল্পনা”-কে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রোডম্যাপে পরিণত করা।
