শিক্ষকের জন্য বিনিয়োগ, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

0
848

শিক্ষকের জন্য বিনিয়োগ, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
ড. মো:শাখাওয়াত উল্লাহ চৌধুরী, বিভাগীয় প্রধান , সাধারণ শিক্ষা বিভাগ, সাদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

শিক্ষা মানুষের অন্যতম প্রধান মৌলিক অধিকার । সবার জন্য শিক্ষা বিকাশের কারিগর হিসেবে নিয়োজিত শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৯৪ সালের পর থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। আগামী পৃথিবী যাদের হাত ধরে এগিয়ে যাবে শিক্ষার মাধ্যমে তাদের যথাযোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মহান ও গুরুদায়িত্ব পালন করছে শিক্ষকরাই। । শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ২০১৩ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক তাঁর বানীতে বলেন:

“Teachers’ professional knowledge and skills are the most important factor for quality education. This World Teachers’ Day, we call for teachers to receive stronger training upfront and continual professional development and support... “  Irina Bokova, UNESCO Director-General

পছেনে ফিরে তাকালে আমরা দখেতে পাই, ১৯৬৬ সালে প্যারসিে শক্ষিকরে র্মযাদা সংক্রান্ত আন্তঃসরকার সম্মলেনে ইউনস্কেো এবং আর্ন্তজাতকি শ্রম সংস্থা শক্ষিকদরে অধকিার, দায়ত্বি এবং র্মযাদা সর্ম্পকে একটি যৌথ সুপারশিমালা প্রণয়ন কর।ে উক্ত সুপারশিমালায় শক্ষিকতা পশোকে সম্মানজনক অবস্থানে নয়োসহ শক্ষিক প্রশক্ষিণ, নয়িোগ ও পদোন্নত,ি দায়ত্বি ও অধকিার, চাকুররি নরিাপত্তা, শৃঙ্খলা বধিানরে প্রক্রয়িা, পশোগত স্বাধীনতা, র্কাযক্রম র্পযবক্ষেণ ও মূল্যায়ন, শক্ষিাসংক্রান্ত নীতনির্ধিারণী প্রক্রয়িায় অংশগ্রহণ, র্কাযকর শক্ষিাদান ও শখিনরে পরবিশে এবং সামাজকি নরিাপত্তা নশ্চিতিকরণরে উপর গুরুত্ব দয়ো হয়ছে। কন্তিু সুপারশিমালা প্রনয়ণরে ৪৮ বছর পরওে অনকে উন্নয়নশীল দশেইে শক্ষিকদরে অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি হয়নি।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে শিক্ষাখাতে উন্নয়নের জন্য নেয়া হয়েছে নানাবিধ উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় শতভাগ ভর্তি, ২৬১৯২টি বিদ্যালয়ের ১,০৪,০০০ জন শিক্ষককে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসা। এতোসব উদ্যোগের পরেও সবাইকে মানসম্মত শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়লেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এক্ষেত্রে আর্থিক ও অবকাঠমোগত সীমাবদ্ধতাও অনেকাংশে দায়ী। মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের জন্য শিক্ষকদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে তোলার অপ্রতুলতা রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হলেও তার আশানুরূপ বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাই না। এ বিষয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলো কাজ করলেও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য যেতে হবে আরো অনেক দূর।

এ বাস্তবতার আলোকে এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘Invest in the future, Invest in Teachers’ যার বাংলা ভাষান্তর করা হয়েছে “ শিক্ষকের জন্য বিনিয়োগ, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ!”

জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষক দিবস :বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে: ক.একই পদ্ধতির গণমূখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রনোদিত নাগরিক স্ৃষ্টির জন্য ,গ) আাইনের দ্বারা নির্ধরিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবন্থা করিবেন ।৭ ডিসেম¦র ২০১০ তারিখে জাতীয় সংসদে আলোচনা অন্তে সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় শিক্ষানীতি গৃহীত হয়েছে। শিক্ষানীতিতে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য , প্রাকপ্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা,বয়স্ক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক ও কারিগরী শিক্ষা ,মাদরাসা শিক্ষা,ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাসহ মোট ২৮টি অধ্যায় ও ২টি সংযোজনী রয়েছে। এ শিক্ষানীতিতে সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রনয়নও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন প্রস্তাবসহ বিজ্ঞানশিক্ষা,তথ্যপ্রযুক্তিও কৃষি বিষয়ক নির্দেশনা রয়েছে।

বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশাটি তেমন জনপ্রিয় না হওয়ায় এখনও অনেক কৃতি শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করে এই পেশায় আসতে চায় না। অথচ মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান ও আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে পেশাগত দক্ষতা সম্পন্ন বিপুল সংখ্যক শিক্ষক প্রয়োজন। ইউনেস্কো ইন্সিষ্টিটিউট ফর স্টেটিসটিকস্্ অনুসারে মানসম্মত শিক্ষকের স্বল্পতার কারণে অনেক দেশে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যহত হচ্ছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধুমাত্র শিক্ষকদের ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষণের কথাই বলে না, বরং আগামী প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষার কথা চিন্তা করে শিক্ষকতা পেশাকে আরও আকর্ষণীয় এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের কথাও বলে।

বাংলাদেশে গণসাক্ষরতা অভিযান ২০০৭ সাল থেকে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন এবং সহযোগী সংগঠনসমুহের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন করে আসছে। কিন্তু এ বছর এসময়ে দেশের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব থাকার কারণে অক্টোবর মাসের ৩য় সপ্তাহে (১৯-২২ অক্টোবরের মধ্যে যে কোন দিনে) দিবসটি উদযাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ উপলক্ষে গণসাক্ষরতা অভিযান সমন্বয়ক হিসেবে সারা দেশে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি ও অন্যান্য পেশাজীবী সংস্থার সাথে সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা সভা, মতবিনিময় সভা, সংবাদপত্রে গণআহŸান প্রকাশ, র‌্যালী, মানববন্ধন ও উপকরণ তৈরি ইত্যাদি কর্মসূচি আয়োজন করবে।

কর্মসূচি আয়োজনের উদ্দেশ্য

– শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করা এবং তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
– “সবার জন্য শিক্ষা”-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষকদের কার্যকর ভূমিকা পালন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ ও রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি আয়োজন:

– জাতীয় পর্যায়ে দিবসের প্রতিপ্রাদ্যের আলোকে র‌্যালী ও আলোচনা সভাসহ আরো কর্মসূিচ আয়োজন করা যেতে পারে।
– এ দিবসের প্রতিপাদ্য নিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল-এ দিবটিসর তাৎপর্য তুলে ধরে টক শো করা যেতে পারে।
– শিক্ষক দিবসের দাবিগুলো নিয়ে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্যেশ্যে পত্রিকায় উম্মুক্ত আবেদন (Open Appeal) প্রকাশ করা যেতে পারে।

স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসূচি আয়োজন: এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে অভিযানের বিভিন্ন কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষক সংগঠনসমূহ/ সহযোগী সংগঠনকে নির্বাচিত/মনোনীত করা যেতে পারে।

অন্যান্য কর্মসুচি: বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশাটি তেমন জনপ্রিয় না হওয়ায় এখনও অনেক কৃতি শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করে এই পেশায় আসতে চায় না। অথচ মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান ও আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে পেশাগত দক্ষতা সম্পন্ন বিপুল সংখ্যক শিক্ষক প্রয়োজন। ইউনেস্কো ইন্সিষ্টিটিউট ফর স্টেটিসটিকস্্ অনুসারে মানসম্মত শিক্ষকের স্বল্পতার কারণে অনেক দেশে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যহত হচ্ছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধুমাত্র শিক্ষকদের ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষণের কথাই বলে না, বরং আগামী প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষার কথা চিন্তা করে শিক্ষকতা পেশাকে আরও আকর্ষণীয় এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের কথাও বলে।

এবারের প্রতিপাদ্যের আলোকে (Invest in the future, Invest in Teachers!) জনমানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরও কিছু অতিরিক্ত কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে যা শিক্ষক সমিতি এবং সহযোগী সংগঠনের মতামতের প্রেক্ষিতে চূড়ান্ত করা হবে।

অংশগ্রহণকারী

এই কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের প্রতিনিধি স্থানীয় নেতৃবৃন্দ/ জনপ্রতিনিধি/ শিক্ষাবিদ/ নীতিনির্ধারকসহ সিভিল সোসাইটি নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়াও শিক্ষক সংগঠনসমূহের প্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এসএমসি সদস্য, গণমাধ্যমের প্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া যে সকল এলাকায় কমিউনিটি ওয়াচ-এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সে সকল এলাকায় ওয়াচ গ্রæপের সকল সদস্য ও এলাকার অর্ন্তভূক্ত স্কুলসমুহের শিক্ষকদের উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা আশা করি, এ বছরও গণসাক্ষরতা অভিযান তার সকল সহযোগী সংস্থা ও শিক্ষক সংগঠনসমূহকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে সারা দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপনের মাধ্যমে শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।

উপসংহার:
একটি জাতিকে সুশিক্ষিত করে সঠিক পথপ্রদর্শনের মাধ্যমে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারেন শুধু শিক্ষকরাই। আর এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত এবং নিবেদিত শিক্ষক। শিক্ষকদের দক্ষতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে সময়োপযোগী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে শিক্ষার মানন্নোয়ন ঘটবে।