ব্রেক্সিট নিয়ে কী ভাবছেন বাংলাদেশিরা ?

0
532

তিন বছরের টানাপড়েন শেষে জানুয়ারি ৩১, ২০২০ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হচ্ছে ব্রেক্সিট৷ অনেকে বলছেন, এখন থেকে পালটাতে থাকবে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাকি ইউরোপের সম্পর্ক, পালটাবে অভিবাসীদের জীবনধারাও৷ যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি অভিবাসীরা কী ভাবছেন?

ব্রেক্সিট নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বাংলাদেশিরাই৷ এদের কেউ কেউ বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ডে গিয়ে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম শেষে সেদেশের নাগরিক হয়েছেন, কারো জন্ম ইংল্যান্ডেই৷ আবার কেউ ইউরোপের অন্য দেশে নাগরিকত্ব পেয়ে ইংল্যান্ডে এসেছেন আরো উন্নত জীবনের আশায়৷ ব্রেক্সিট পরবর্তি অভিবাসন আইনে যে পরিবর্তনগুলো আসতে যাচ্ছে তা নিয়ে চিন্তিত মানবাধিকারকর্মীরা । ইউরোপিয়ান মানবাধিকার আইনের যে সুফল ইমিগ্র্যান্টরা ভোগ করছেন, বিশেষ করে ১০ বছরে ইনডিফিনিট লিভ টু রিমেইন পাবার নিয়মটি থাকবে কিনা এনিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ব্রেক্সিট পরবর্তী আইনগুলো কেমন হবে, তা নিয়ে দেশটির সরকারও পুরোপুরি নিশ্চিত নয় ৷

হোম অফিস (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) বলেছে দক্ষ মানুষ ছাড়া তারা ব্রিটেনের নাগরিকত্ব না দেয়ার চিন্তা ভাবনা করছে । ব্রিটেন ব্রেক্সিট পরবর্তী অর্থনৈতিক ধকল কাটাতে টিয়ার ফোরের মতো সহজ পয়েন্ট ভিত্তিক সিস্টেমে আবারো ইমিগ্র্যান্ট আনার প্ল্যান করছে। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, এটা একটা ট্র্যাপ।লাখ লাখ টাকা খরচ করে ব্রিটেনে মানুষ আসবে ঠিক ই কিন্তু এখানে এসে কোন উপায়েই নাগরিকত্ব লাভ অবধি টিকতে পারবে না।”

পূর্ব লন্ডনে বসবাসরত মামুনুর রশীদ একটি রিটেইল কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনার কাজ করেন৷ তিনি মনে করেন ব্রেক্সিটের খারাপ প্রভাব যেমন পড়বে, এর ভালো কিছু দিকও রয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘মানবিক হিসাব করলে, মনে হয় থেকে গেলে (ইউরোপে) ভালো হতো। আবার ইউরোপের অন্য সব দেশের আর্থিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এটাই ভালো হয়েছে। তবে এর আসল ইমপ্যাক্ট বুঝতে আরো কয়েক বছর সময় লাগবে। মাঝামাঝি ঝুলে থাকার চেয়ে একদিকে হয়েছে সেটা আপাতত ভালো।”

ব্রেক্সিটের পরপর গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনে উঠে আসে দক্ষিণ এশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়া অভিবাসীদের কথা৷ বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বেশ বড় সংখ্যার অভিবাসী পূর্ব লন্ডনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন৷ সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও তাদের বেশিরভাগই ব্রেক্সিটের পক্ষে বোট দিয়েছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়৷ বিশেষ করে লুটন অঞ্চলে, যেখানে অভিবাসীদের আধিক্য, ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট পড়ে ৫৬ শতাংশ৷ পুরো ব্রিটেনে এ হার ছিল কেবল ৫২ শতাংশ৷

এর কারণ হিসেবে মনে করা হয় দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসীদের সঙ্গে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের বাড়তে থাকা সংঘাত৷ একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়া অভিবাসীদের সঙ্গে ইউরোপের অন্য দেশ থেকে ইংল্যান্ডে আসা অভিবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থের সংগাতের বিষয়টিও জড়িত৷ যুক্তরাজ্যের কারারক্ষণ কর্মকর্তা সাইফ মিঠু মনে করেন, এসব নানা কারণে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ কাজ করেছে৷

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্রেক্সিটের পক্ষেই ছিলো বেশি। যারা সরাসরি যুক্তরাজ্যে এসেছিলো ছাত্র অথবা অন্য কোনো ক্যাটাগরিতে – তাদের যেই স্ট্রাগলটা  করতে হয়েছিলো, ব্রিটিশ পাসপোর্ট বা অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পেতে, ইউতে থাকার ফলে অন্য বাংলাদেশিরা সহজেই যুক্তরাজ্যে এসে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পেয়ে যেতো। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে অবস্থান করেও যারা বিভিন্ন আইনি জটিলতায় ভুগছিলেন – তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল এই ইইউ বাংলাদেশি কমিউনিটি। আমাদের কমিউনিটিতে অন্তত এই বিভেদটা বন্ধ হবে। প্রত্যেকে তার নিজ নিজ যোগ্যতায় সবকিছু অর্জন করবে। কোনো বিশেষ দেশ বা অঞ্চল থেকে আসার কারণে কোনো বিশেষ সুবিধা থাকবে না।”

এই নানামুখী দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে সাংবাদিক শারমিন ভূট্টোর কথাতেও৷ ব্রেক্সিট ইস্যু নিয়ে নানা জায়গা থেকে আসা বাংলাদেশিদের মধ্য়ে দ্বন্দ্ব চোখে পড়ার মতো বলে মনে করেন তিনি৷ বিশেষ করে ইটালিতে নাগরিকত্ব পাওয়া বাংলাদেশিরা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মুক্ত চলাচলের সুযোগ নিয়ে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হতে চেয়েছেন৷ এর ফলে ইটালিয়ান বাংলাদেশিদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের ব্যাপক বিরোধ দেখা দিয়েছে৷

ভূট্টো বলেন, ‘‘অনেকে তো ইটালি থেকে আসা বাঙালিদের দেখতে পারেন না। তবে যাই বলি না কেনো, মাল্টিকালচারাল শহর হিসেবে লন্ডনের যে খ্যাতি আছে তাতে কিছুটা হলেও ভাটা পড়বে। ইউরোপীয় দেশ থেকে আসা মানুষগুলো ব্রিটেনের যে নিয়মগুলো ভঙ্গ করছিলো তা কিন্তু চাইলেই সমাধানযোগ্য। এখানে আমি বলবো ব্রিটেনের অবস্থা অনেকটা ” চোরকে বলে চুরি কর আর গৃহস্থরে বলে সজাগ থাক” এই অবস্থা।”

ব্রেক্সিট পুরোপুরি কার্যকর হতে আরো এক বছর সময় লাগবে৷ কিন্তু কড়া অভিবাসন নীতি চালু হলে অভিবাসীদের ভবিষ্যত কেমন হবে, সে নিয়ে সংশয় থাকছেই৷