নতুন স্বাভাবিক বিশ্ব: দক্ষ, পেশাদারিত্ব এবং প্রযুক্তির বিশ্ব :-সরওয়ার জাহান

0
418

নতুন স্বাভাবিক বিশ্ব: দক্ষ, পেশাদারিত্ব এবং প্রযুক্তির বিশ্ব :-সরওয়ার জাহান

সভ্যতা এখন এক বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করছে। সর্বগ্রাসী এ বৈশ্বিক দুর্যোগ আর কখনো দেখেনি। বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা এত ব্যাপক বিপর্যয় কেউই ভাবেনি। অথচ সেখানেই অস্তিত্বের সংকট তীব্র রূপ নিয়েছে। নতুন এই করোনাভাইরাস বা কোভিড–১৯, যা সারা বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে । টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বকাপ খেলার স্কোরের মত বিভিন্ন দেশের আক্রান্তদের সংখ্যা আর মৃত্যুর সংখ্যা সরাসরি জানান দিচ্ছে ।

এই মহামারী কবে নিয়ন্ত্রনে আসবে কেউই জানে না । মহামারী পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে তা কারো জানা না থকলেও, এটা নিশ্চিত যে, করোনা পরবর্তী বিশ্ব অনেকটাই পাল্টে যাবে। পৃথিবীর সবাই ‘নতুন স্বাভাবিক’ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে । মহামারীর কারনে নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন দেশ যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে তা ভবিষ্যত পৃথিবীর গতিপথ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা বদলে দেবে।

২০০১ সালে যুক্তরাস্ট্রে টুইন টাওয়ার পতনের পর, নিরাপত্তার নামে গোটা বিশ্বের সমাজ ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজানো হয়েছে। তেমনি ২০১৯–এর ডিসেম্বরের পরের পৃথিবী আগের মতো আর থাকবে না। পরিবর্তনটা হবে অস্বাভাবিক ভাবে ভিন্ন । নতুন অনেক কিছুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে পৃথিবীকে । কিছু কিছু পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে উঠবে। যেখানে আবেগের কোন সুযোগ থাকবে না । দূরদর্শিতা আর পেশাদারিত্ব সাথে দক্ষতা গড়ে না উঠলে আমাদের মত দেশকে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে । এই মহামারিতে প্রতিদিনই অনেক কিছুই মানুষ নতুন করে শিখছে। যেসব দেশ ও সরকার আগে আগে সততা ও নিষ্ঠার সাথে সমস্যার রূঢ়তা চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ মাত্রায় সক্রিয় হয়েছে, তারা ভাইরাসের আগ্রাসন দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে ।

বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী জোট মহাজোটগুলোর নেতারা করোনাকালে বিশ্বকে মোটেই নেতৃত্ব দিতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র সময়মতো নিজের অনেক নাগরিকের ‘ভাইরাস টেস্ট’ করাতে পারেনি, এবং বৈশ্বিক ‘গভর্ন্যান্স-টেস্টে’ এত দিনকার অবস্থান হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করতে পারে, সেরকম একটি কথাও বলেনি । যুক্তরাষ্ট্রর জন্যে ইউরোপ যুগের পর যুগ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে শরিক হয়েছে । অথচ মহামারীতে ওয়াশিংটন ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে । কেউ কি কখনো ভেবেছে মহামারির কারনে যুক্তরাষ্ট্রর নাগরিকরা চির মিত্র ইউরোপে প্রবেশে করতে পারবে না । এটা  বৈশ্বিক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পালাবদলের ইংগিত । অতীত মহামারির ইতিহাসেও তাই বলে—অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়ে বহু রাজত্ব নুয়ে পড়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে ‘স্প্যানিশ-ফ্লু’র সময় অস্ট্রিয়া আর জার্মানি শক্তিমত্তা হারিয়ে ছিল । নতুন করে উত্থান হয়েছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের।

অদৃশ্য এক শক্রু মহামারিরুপে মানুষকে ঘরবন্দী করার কারনে, ২০২০ সাল হবে হারিয়ে যাওয়া একটি বৎসর। বেচে থাকাটাই হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া। এরই মধ্যে দেশে দেশে নাগরিকদের সঙ্গে সরকারের বা নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞেরা আগামীতে এমন আরও পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছেন । আমরা এখন বুঝি কোনো কিছু স্পর্শ করা, কারও সঙ্গে থাকা বা আবদ্ধ কোনো জায়গায় শ্বাস নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই সচেতনতা স্বভাবজাত হয়ে উঠতে পারে।কেউই হয়তো আর বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস ছাড়তেই পারব না। কারও সঙ্গ পেলে বা কাছে এলে যে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ ছিল, তার বদলে অনুপস্থিতিতেই হয়তো বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হবে । ব্রডব্যান্ডের সুবিধা না থাকা মানে নিত্যদিনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া। তবে মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়বে। দূরের মানুষের সঙ্গে দূরত্বটাকেই নিরাপদ বোধ করবে।

করোনা মহামারীর শুরুর আগেই বাংলাদেশ ডিজিটালে পা দিয়েছে, ডিজিটালে আমরা দ্রুত সচেতন হয়েছি। মহামারীর আগে মোবাইল কম্পানিগুলি প্রতিযোগিতায় ছিল কার কাছে কত জি এবং সেই জি কোন অঞ্চলে কত দ্রুত চলে । কত মিনিটে কত জি পাওয়া যায়, মোবাইলে এই প্রচার র্বাতা মোটামুটি সকলের সয়ে গেছে । ডিজিটাল প্রয়োগ এবং মোবাইল কম্পানি গুলির কথা কতটুকু বাস্তবতার সাথে মিল আছে তা দেখা গেছে মহামারীর সময়।

মহামারী পরবর্তী নুতন স্বাভাবিক বিশ্ব উৎপাদন ও বিপণনের ব্যাপক অনলাইন যুগে ঢুকছে । তবে আমাদের উৎপাদনশীলতা ও বিপনন ব্যবস্থায় যদি কার্যকর বাস্তব ব্যবস্থা না থাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে । দোকানদারদের কাছ থেকে ‘বাজার’ চলে যাবে ‘ই-কমার্স’-এর দুনিয়ায়। ঘরে ‘কাজ’ অনলাইনে ‘বিক্রি’ এবং অনলাইনে শিক্ষা চলেছে। আড্ডা, চলাচল ও সমাবেশে আগের মতো স্বাধীনতা থাকবে না। মানুষের নিরাপত্তা এবং ‘নিরাপদ সমাজ’ গড়ার প্রত্যয়ে মানুষ নিয়ন্ত্রিত হবে। অনলাইনভিত্তিক প্রযুক্তি নির্ভর রাজনীতি চলবে । করোনার কারনে এবার তা প্রাতিষ্ঠানিকতার রুপ পাবে । আমরা এক নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থার দিকেই ধাবিত হচ্ছি । কিছু কিছু পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে উঠবে। করোনাভাইরাস যে পরিবর্তন মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে …

(১)সংকুচিত হবে শ্রম বাজার; (২)প্রশারিত হবে অটোমেশনের;(৩)ধর্মীয় চেতনা বাড়বে;(৪)অনলাইন শিক্ষা গুরুত্ব পাবে(৫)শুরু হবে টেলিমেডিসিনের; (৬)পারিবারিক আন্তরিকতা বাড়বে; (৭)সামাজিক মূল্যবোধ পাল্টে যাবে; (৮)ভার্চ্যুয়াল জগতের প্রভাব বাড়বে (৯)নতুন নাগরিক কেন্দ্রীকরণ শুরু হবে; (১০) বাড়বে রাষ্ট্রীয় নজরদারী ও নিয়ন্ত্রন; (১১)অনেক আইন কাজে আসবে না; (১২) শুরু হবে স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল জীবনযাপন; (১৩)বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনার জাগরন; (১৪) প্রথাগত পরিবর্তে ভার্চুয়াল বাজার বাড়বে; (১৫) আসবে ইলেকট্রনিক ভোট এবং চিঠির মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা ।

অটোমেশন ব্যাপকতার কারনে শ্রমজীবী নির্ভর দেশগুলোর জন্য চিন্তার কারন হবে । বিশ্বজুড়ে দরিদ্র শ্রমিক গ্রহণে স্বাস্থ্য বিবেচনা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পাবে । অদক্ষ শ্রমিক গ্রহণের হারও কমে আসবে। উদীয়মান প্রযুক্তি নতুন পণ্য ও সেবা মানুষের চাহিদার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের  আনন্দ ও উপভোগ বাড়িয়ে তুলবে। ঘরে বসেই সব ধরনরে সেবা নতুন প্রযুক্তির আওতায় চলে আসবে । যদিওবা অনেক কিছুই শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে ।

করোনাভাইরাসের মহামারির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাসি বুঝতে পেরেছে —যে মূল্যবোধ নিয়ে রাস্ট্র চলছে, তার বদলে কার্যকর গণতন্ত্র অপরিহার্য, যা কার্যকরভাবে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সক্ষম। এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তার দেখভাল করে, সেসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক অনুগতদের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা উচিত। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত যুক্তিসংগত প্রক্রিয়ায় আবেগে নয়, যার ভিত্তি হবে বিজ্ঞান, ইতিহাস ও ভূরাজনৈতিক জ্ঞান। করোনার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, একটি সুস্থ সমাজের জন্য কর্মক্ষম ও নিখুঁত সরকার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়তো থাকবে আরও অনেকদিন । অনলাইনভিত্তিক চলেছে শিক্ষা তা ক্রমেই বাড়বে। যারা শিক্ষার্থীদের অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর যে বিরোধিতা করেছিল, তা এই সংকটের মুখে তরুপের তাসের মত উড়ে গেছে। এখন অনলাইন হোমওয়ার্ক ও ঘরে থেকে আংশিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে এবং তাকে তারা যেভাবে গ্রহণ করেছে, তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। গতানুগতিক শিক্ষা বা শ্রেণী কক্ষে শিক্ষা পদ্ধতির যদি পরিবর্তন না হয় প্রযুক্তি র্নিভর সমাজে সনদধারী যোগ্যতাহীন কিছু মানুষ প্রতি বৎসর তৈরী হবে  ।

স্প্যানিশ-ফ্লুর পরই বিশ্বজুড়ে নারীরা কাজে নেমেছিল। মহামারির পর কী হবে তা বলার সময় হয়নি। তবে মন্দার কারনে অসংখ্য মানুষ চাকরি হারাবে। বিলম্বিত হবে নতুন নিয়োগের । নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে করোনা-পরবর্তী সময়ে চাকরির বাজার কঠিন হয়ে উঠবে। এই কঠিন চাকরির বাজারে শুধু যোগ্যরাই টিকে থাকবে। যোগ্যতার পাশাপাশি প্রমাণ দিতে হবে পেষাদরিত্বের । কোন ধরনের অফিস ষড়যন্ত্র কাজে আসবে না । দক্ষতার আর পেষাদরিত্বের অভাবে আপনা আপনি ছিটকে পড়বে। এই মহামারির কারনে অনেকই  শিখছে যে বাড়ি থেকেও দক্ষতার সঙ্গে প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজ করা যায়। চাকরির ধারা গুলি নতুন করে গঠিত হবে । কাজের জবাবদিহিতাও সেই ভাবেই তৈরী হবে । ঘড়ি ধরে নয়টা-পাচঁটার কাজের অভ্যাস ছাড়তে হবে। প্রথাগত পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে। বৈশ্বিকভাবেই নীতি প্রণয়নে আসবে আমুল পরির্বতন ।

এসব পরিবর্তনের সাথে অবশ্যই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। করোনা পরবর্তি বিশ্বে নতুন পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে নমনীয় থাকলেই সফল হওয়া সহজ হবে । নতুন চ্যালেঞ্জ আর পরিবেশের সাথে টিকে থাকার ক্ষমতা যদি না থাকে তাহলে চাকরির দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়তে হবে । সার্বক্ষনিক নিজেকে আপডেট করে রাখতে হবে ।

যে কোনো কঠিন সময়ে অনেকেই ভীত হয়ে পড়ে, হাল ছেড়ে দিতে চায়, আস্থা হারিয়ে ফেলে, পরচর্চায় লিপ্ত থাকে । কিন্তু নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে দুঃসময়ে যে নেতৃত্ব দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক গতিতে রাখতে পারবে তিনি শুধু প্রশংসিতই হন না, তার কর্মস্থলের চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারা মানেই সফলতার একেকটি ধাপ অতিক্রম করা। তাই করোনা-পরবর্তী চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে এবং নিজেকে এগিয়ে রাখতে হলে পেশাদারিত্বের সাথে নেতৃত্বের দক্ষতা প্রযুক্তির দক্ষতা অবশ্যই থাকতে হবে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সাদার্ন ইউনিভার্সিটি ও টেকসই উন্নয়নকর্মী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here