অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে অসহনীয় শব্দ দূষণ!

0
205

অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে অসহনীয় শব্দ দূষণ!

হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সাধারণত রোগী ও লাশ পরিবহনে সেবা দিয়ে থাকে । সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ছাড়াও বেসরকারি হাসপাতাল ও বিভিন্ন সংস্থা এ সার্ভিস দিয়ে থাকে । মুমূর্ষু রোগীকে দ্রæত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স নামক এই বিশেষ গাড়ীই ভরসা । অথচ অতি গুরুত্বপূর্ণ এই যানের সাইরেনের কারণে শব্দ দূষণের তীব্রতা বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে চলেছে! ফলে অসুস্থতা ও শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে অনেকেরই। চারিদিকে গান বাজনা, মাইকিং, জেনেরেটর, স্থাপনা তৈরি ও ভাঙার শব্দ, বিভিন্ন রকমের যানবাহনের হাইডোলিক হর্নের সাথে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ মিশে এক অস্বস্তিরকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পুরো নগরে। আর এই অসহনীয় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কারো কোনো উদ্যোগ নেই । শব্দদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বিষয় হিসেবে দাবি করছেন নগরবাসী। অনেক সময় পুলিশের গাড়ির সাইরেন আর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের আওয়াজ বুঝাও যায় না । এটাও পৃথক করে দেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর অনেক দেশেই তা প্রচলন আছে। ফলে দুটির সাইরেন আলাদা হলে ভিড়ের মধ্যেও দূর থেকে চিনে ফেলতে অসুবিধা হবে না।

অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দমাত্রা নির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত না থাকায় বা প্রয়োগ না হওয়ায় এই বাহনের চালকরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। প্রাণ বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব যে বাহনের, তার বিরুদ্ধেই আইন লংগন করা অহরহ অভিযোগ শুনা যায় । অ্যাম্বুল্যান্সের অসহনীয় আচরণ রাশ টানতে খুব শিগগিরই আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন। ভারতের বিধানসভায় উত্থাপন হয়েছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস বিল ২০১৯’।
সময় এসেছে অ্যাম্বুল্যান্সে সাইরেনের শব্দমাত্রা বেঁধে দেওয়া । অ্যাম্বুল্যান্স সাইরেনের বিকট শব্দজনিত দূষণ নিয়ে বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিওবা কারো কারো মতে রোগাক্রান্তকে যতটা সম্ভব কম সময়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে রাস্তা খালি পেতে সাইরেন বাজিয়ে এ্যাম্বুলেন্স ছুটে । তবে তার শব্দের মাত্রা থাকবে নির্দিষ্ট। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন নিয়ে বিভিন্ন নাগরিক মহলের অভিযোগ আছে, পরিবেশ দপ্তরের উচিৎ সাইরেনের শব্দের ডেসিবেল মাত্রা বেঁধে দেওয়ার । দিনের বেলা ৬৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৫৫ ডেসিবেল শব্দমাত্রা সহনশীল হবে বলে মনে করেন অনেকেই। শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক এলাকা তো বটেই, এমনকি হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সাইলেন্স জোন হিসেবে স্বীকৃত এলাকায় ডেসিবেল মাত্রা লঙ্ঘন করার বিষয়টি দেখা উচিৎ। পরিবেশবিদদের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন এখন ১২০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ সৃষ্টি করে। শুধু তাই নয়, সাইরেন টানা বেজে চলে বলে এর প্রভাব সাধারণ ১২০ ডেসিবেল শব্দের চেয়ে বেশি হয়। ইতিপূর্বে নাক-কান বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শরিফুজ্জামানের পিএইচডি গবেষণায় এবং সাদার্ন ইউনিভার্সিটি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের উদ্যোগে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকার শব্দ দূষণের মাত্রা পরীক্ষায় সত্যতা পাওয়া গেছে। আর এই শব্দদূষণ মানুষের বিরক্তির উদ্বেক করে। মেট্রো এলাকাকে সামগ্রিক ভাবে ‘সাইলেন্স জোন’ হিসেবে ঘোষণা করে অর্থাৎ, সে ক্ষেত্রে শহরে দিনে শব্দসীমা সহনশীল বা ৫০-৬৫ ডেসিবেল ও রাতে শব্দসীমা ৪০-৫৫ ডেসিবেলের মধ্যে রাখা যেতে পারে । অনেক সময়ে রোগী না থাকলেও কিংবা রোগীকে আনতে যাওয়ার কোনও বিষয় না-থাকলেও ফাঁকা অ্যাম্বুল্যান্সকে টানা সাইরেন বাজিয়ে পথে চলতে দেখা যায়।
বর্তমানে যত অ্যাম্বুল্যান্স চলে, সেগুলোর কোনও দপ্তরেই ‘অ্যাম্বুল্যান্স’ হিসেবে নথিভূক্ত নয়। নথিভূক্তিকরণের ব্যবস্থা না-থাকায় এই মুহূর্তে কোথায় কত অ্যাম্বুল্যান্স চলে, তার সঠিক সংখ্যা জানা নাই ।অনেকেই মোটর গাড়ি হিসেবে নথিভুক্ত করে থাকে । অথচ কোনও যানবাহনকে অ্যাম্বুল্যান্স হিসেবে পথে নামানোর আগে ‘অ্যাম্বুল্যান্স’-এর রেজিস্ট্রেশন নেওয়া উচিৎ । শুধু তাই নয়, এখন ‘সাধারণ অ্যাম্বুল্যান্স’ এবং ‘বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্সে’ আইনি ভাবে পৃথক করাও নেই। অনেক সময় দেখা যায়, কোনও ‘বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্স হিসেবে দাবি করলেও উপযুক্ত কাঠামোও নেই। অ্যাম্বুল্যান্সকে কাঠামো বিচার করে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া দরকার।
কার্যকরী আইনের জন্য অ্যাম্বুল্যান্সের স্বাস্থ্য দপ্তরের রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট থাকতে হবে। অ্যাম্বুল্যান্স কোন প্রকারের, কী কী পরিসেবা দেয় এবং তা কত শব্দমাত্রার সাইরেন ব্যবহার করবে, সব লেখা থাকবে। পথে যে কোনও পুলিশকর্মী সেই রেজিস্ট্রেশন খতিয়ে দেখে যদি গরমিল পান তা হলে ব্যবস্থা নিতে পারবেন। জেলার ক্ষেত্রে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীন টিম অ্যাম্বুল্যান্স পরীক্ষা করে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার দায়িত্বে থাকতে পারে ।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা বড়সড় দুর্ঘটনা ছাড়া অ্যাম্বুল্যান্স থেকে যাতে সাইরেন তুলে দেওয়া যায়, সেই ব্যাপারেও চিন্তাভাবনা শুরু করার সময় এসেছে । ‘এ্যাম্বুলেন্সের সামনে ফ্ল্যাশার-সহ বাতিই রাস্তাসহ অন্যান্য যানবাহন ও পথচারীদের সতর্ক করার জন্যই যথেষ্ট। খুব বড় ঘটনা না হলে সাইরেনের প্রয়োজন হয় না। শব্দ দূষণ ঠেকাতে ১০ ফেব্রæয়ারি ২০২০ নগরীতে উচ্চ মাত্রার হর্ন ও সকল প্রকার শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। এতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স এর আওতার বাইরে রাখা হয়। এতে বলা হয়, শব্দদূষণ স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। উচ্চমাত্রার শব্দ কানের ক্ষতিসাধন ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করে। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কতিপয় রোগের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার শব্দ ভীষণ ক্ষতিকর। বিশেষ করে দীর্ঘসময় ধরে উচ্চমাত্রার শব্দ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। শিশু-বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা এর দ্বারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। উচ্চমাত্রার শব্দ একদিকে যেমন দূষণ তেমনি জনদুর্ভোগের কারণ। সিএমপি কমিশনারের এই উদ্যোগকে চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক স্বাগত জানিয়েছে। তবে তা সব ক্ষেত্রেই নির্দেশনা থাকা জরুরি। কারণ অ্যাম্বুল্যান্স সাইরেনেও শব্দদূষণ হয় ।

সরওয়ার জাহান
প্রতিষ্ঠাতা, সাদার্ন ইউনিভার্সিটি ও টেকসই উন্নয়নকর্মী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here