পরাজয়ের অপেক্ষায় ইসরায়েল জয় ছাড়া কিছুই দেখছে না হামাস

0
13

পরাজয়ের অপেক্ষায় ইসরায়েল জয় ছাড়া কিছুই দেখছে না হামাস

দখিনা ডেস্ক:‌ইসরায়েল দেশটির অত্যাধুনিক অস্ত্রের অভাব নেই; যুক্তরাষ্ট্রও তাদের নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে বিমান হামলা চালিয়ে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচার হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল।হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির, স্কুল- সব গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এদের মধ্যে কয়েক হাজার শিশু ও নারী।শুধু অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকলেই যুদ্ধ জয় করা যায় না। স্থল-অভিযানকে সামনে রেখে ইসরায়েল দৃশ্যত বড় একটি পরাজয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। লোক দেখানো আত্মতুষ্টি জোগালেও দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহভাবে পরাজয় অপেক্ষা করছে ইসরায়েলের জন্য।

৭ অক্টোবর ইসরায়েলের সব দম্ভ নাস্তানাবুদ করে দেশটির ভেতরে গিয়ে বিশাল টার্গেট সম্পন্ন করে বীরদর্পে ফিরেছিল হামাসের যোদ্ধারা। এরপর ইসরায়েলের নির্বিচার বিমানহামলা এবং হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। হাজার হাজার শিশু, নারী, বৃদ্ধ  ফিলিস্তিনির প্রাণহানি হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের কাছে স্পষ্ট হয়েছে, ইসরায়েল আসলেই একটি বর্বর রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ডগুলো বেপরোয়াভাবে উপেক্ষা করে দেশটি সারাবিশ্বের সহানুভূতি হারিয়েছে। অনেক দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, অনেকে ছিন্ন করার পথে। যুক্তরাষ্ট্র ও হাতেগোনা কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইসরায়েলের পক্ষে কথা বললেও অনেক দেশই বলছে, হামাসের হামলা শূন্য থেকে হয়নি। ফিলিস্তিনের মানুষ ৭৫ বছর ধরে দখলদারির শিকার হয়েছে। তারা তাদের ভূখণ্ড অবৈধ বসতিতে পরিণত এবং সহিংসতায় জর্জরিত হতে দেখেছে। তাদের অর্থনীতি থমকে গেছে। তারা বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের দুর্দশার রাজনৈতিক সমাধানের আশাও ধূলিসাৎ হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস-ও হামাসের পক্ষেই কথা বলেছে।

হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পক্ষে পশ্চিমা-বিশ্ব যে সহমর্মিত তৈরি করেছিল।হামাসের অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং নিপীড়নের স্বাভাবিক ফলশ্রুতি বিশ্বকে বোঝানো কঠিন ছিল।ইসরায়েল তার আসল চেহারাটা নতুন করে দেখিয়ে প্রমাণ করেছে কত নিষ্ঠুর তারা।বিশ্ব দেখেছে বুঝেছে হামাসের অভিযানই যর্থাথ।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা-বিশ্ব যুদ্ধ বন্ধের কথা বলছে। নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা গণহত্যায় পরিণত হয়েছে।এই হামলা যুদ্ধের নীতিবিরুদ্ধ । কোনো দেশই ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে না। এই হারটা ইসরায়েলের নৈতিক পরাজয়। যা সহজে সারানো সম্ভব নয়।

৭৫ বছরের নিপীড়ন বর্বতা ইসরায়েলের আধুনিক অস্ত্রভান্ডার, সেরা প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সাফল্যের দম্ভ মুহূর্তেই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে হামাস। ইসরায়েলের ভেতরে ঢুকে সেনাঘাঁটিগুলোকে টার্গেট করে যে অভিযান পরিচালনা করেছে প্রতিরোধ গোষ্ঠীটি, তা তারা ৭৫ বছরেও ধারণা করেনি। এক হাজার চার শতাধিক ইসরায়েলিকে নির্মূল করেছেন তারা। আহত হয়েছেন পাঁচ সহস্রাধিক। প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করেছে হামাস ।এই লজ্বাকর পরাজয়ের গ্লানি ইসরায়েলকে আর কখনও সইতে হয়নি।

বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে স্থল-হামলার পরিকল্পনা থাকলেও ইসরায়েলি প্রশাসনের মধ্যেই বড় মতদ্বৈততা আছে।স্থল-অভিযানের পরিকল্পনা এখন অনেকটা স্থবির।যুক্তরাষ্ট পশ্চিমা-বিশ্ব এই অভিযানে সাড়া দিচ্ছে না।বিশ্লেষকরাই বলছেন,স্থল-অভিযানের জন্য রিজার্ভ সেনাদের জড়ো করা হলেও,তারা যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে তৈরি নয়, প্রশিক্ষণও নাই;হামাস মাতৃভূমির জন্য জীবন বিলিয়ে দেওয়াকে তাদের প্রধান কর্তব্য মনে করেন। তাদের ভাষায়, ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন দেওয়ার জন্যই ফিলিস্তিনী শিশুর জন্ম । এই মৃত্যু গৌরবের।

এই যুদ্ধ ইসরায়েলকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে।কারন স্থল-অভিযান হলে যে-কোনো সময় যে-কোনো পরিস্থিতি হতে পারে।এরই মধ্যে রয়েছে ইরানের সর্তকতা,লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ অস্ত্র তাক করিয়ে রেখেছে ইসরায়েলের দিকে।ইয়েমেন থেকে হুথিরা  চালাচ্ছে হামলা।হামলা হচ্ছে সিরিয়া ও ইরাক থেকেও ।পশ্চিমতীরে রয়েছে ইসলামিক জিহাদ ও অন্য প্রতিরোধ সংগঠনগুলো।আবর-ইসরায়েল যুদ্ধগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলেও হামাসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাতার ও তুরস্ক।তাছাড়া বৈশ্বিক তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে রাশিয়া ও চীন।সাউথ আফ্রিকা, আয়ারল্যান্ডসহ অনেক দেশ স্পষ্টভাবে বলেছে, হামাস তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। তারা ইসরায়েলকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে গণহত্যার জন্য নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মুখোমুখি করার দাবি তুলেছেন। সেই দাবি দিনদিন জোরালো হচ্ছে।

পশ্চিমাদের সমীহ করে হামাসের পক্ষে কথা বলতে অনেকে সাহস পেতেন না। এখন এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে বিশ্ব। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন কিংবা রাশিয়া সেই বৈশ্বিক ধারণায় অনেকটা শক্তি জুগিয়েছে। রাশিয়া একাধিকবার জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তুলেছে, যেখানে হামাসকে সন্ত্রাসী না বলায় যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়েছে। এখন চীন ও রাশিয়া বলয়ের দেশগুলোর কাছ থেকে বড় আকারের সহানুভূতি পাচ্ছে হামাস, যেমনটা আগে কখনও পায়নি। তাছাড়া, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে ১২১-১৪ ব্যবধানে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাস হয়েছে, যেখানে একটি পক্ষ হিসেবে হামাসকেই মেনে নেওয়া হয়েছে।

২৪ নভেম্বর শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি হামাসের মর্যাদাকে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতিতে আসাটা ইসরায়েলের জন্য বড় নৈতিক পরাজয় এবং হামাস ও অন্য প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর জন্য বিশাল মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয়। হামাসের বড় অর্জনটি হলো- একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় এসে তারা আন্তর্জাতিকভাবে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। যে সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে আলোচনার জন্য পরিত্যাজ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় তাদের মর্যাদার পরিবর্তন ঘটেছে। ‘সন্ত্রাসী’-র স্থলে হামাসের পরিচয় দাঁড়িয়েছে, তারাই ‘এই অঞ্চলের বৈধ নিয়ন্ত্রণকারী’।এর আগে অন্য দেশের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও সেই চুক্তিগুলো পূর্ণাঙ্গ এবং বহুপক্ষের সম্পৃক্ততায় আন্তর্জাতিক মানের চুক্তি ছিল না।

বন্দিবিনিময়ের সময় হামাস যে চৌকষ নৈপুণ্য দেখিয়েছে, তা বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে। বন্দিদের সঙ্গে তাদের ভালো ব্যবহার বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। হামাসের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া ইসরায়েলিরা গাজায় বন্দি থাকা অবস্থায় সদ্ব্যবহার পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তাদেরকে গাজায় অতিথির মতো সেবা দেওয়া হয়েছে।হামাসের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঙ্গে অকুণ্ঠ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

এখন ইসরায়েল যদি হামাসকে নির্মূলের অভিযানে নামে এবং হামাস যদি তার প্রতিরোধ আন্দোলনের বন্ধুদের নিয়ে তা প্রতিরোধ করে, সেখানেও ইসরায়েলের জয় সম্ভব নয়। আর যদি যুদ্ধের পরিধি বড় হয়? নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া যায়, তেলআবিব এমন একটি পরাজয়ের স্বাদ পাবে, যা ইসরায়েল-রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বড় হুমকির মুখে ফেলবে। এই পরাজয়ের ক্ষত সারানোর কোনো পথ আর তাদের থাকবে না।

যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতির কারণে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে হামাসের প্রতি জনসমর্থন ব্যাপকহারে বেড়েছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ইসরায়েলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।ইসরায়েলকে অর্থনৈতিকভাবেও পঙ্গু করে দিয়েছে হামাস। যুদ্ধের কারণে বিদেশি কর্মীরা গণহারে ইসরায়েল ছেড়েছে। শ্রমশক্তির ঘাটতির কারণে তিন লক্ষ মানুষ সামরিক রিজার্ভে ডাক দিয়েছে দেশটি। যে-কোনো সময় ইসরায়েলের যে-কোনো জায়গায় বোমা পড়তে পারে। সে-কারণে দেশটিতে আগত পর্যটকদের সংখ্যা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। যুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প ও বিনিয়োগ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর হামলার কারণে গাজা ও লেবানন সীমান্তের বিশাল এলাকার অর্থনীতি এখন স্থবির। অনেক জায়গায় কৃষিকাজ নেই; উৎপাদন বন্ধ। তার ওপর গাজায় যে পরিমাণ ব্যয়বহুল বোমা তারা ফেলছে, তার পুষিয়ে আনা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।