করোনা ভাইরাসের হুমকি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতার আহবান

0
450

ভিডিও কনফারেন্সে মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের হুমকি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ায় ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে সদস্য রাষ্ট্র সমূহের শীর্ষ নেতারা তাঁদের মতামত তুলে ধরেছেন ।

রোববার ১ ৫ মার্চ, ২০২০ বিকেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে এক ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দিয়ে সার্কের শীর্ষ নেতারা তাদের এ সংক্রান্ত মতামত গুলো তুলে ধরেন । বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানী ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দিয়ে বলেন করোনা মহামারির চ্যালেঞ্জে মোকাবেলায় সার্ক ভুক্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে এবং সমন্বয় করতে হবে সার্ক ভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত সামর্থ্য, অভিজ্ঞতা ও সম্পদ। শেখ হাসিনা বলেন বাংলাদেশ তার অভিজ্ঞতা এবং কার্যক্রম সার্ক-ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে শেয়ার করতে প্রস্তুত রয়েছে।

ভিডিও কনফারেন্সে বাংলাদেশ ছাড়াও যোগ দেন ভারত, আফগানিস্তান, নেপাল , ভুটান, মালদ্বীপ এবং শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা। পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা।

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সদস্য রাষ্ট্রগুলোয় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর সেই তহবিলে ভারতের পক্ষ থেকে এক কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সার্কের অন্য নেতারা মোদির প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা মোকাবেলায় সার্কের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও কর্মকর্তা পর্যায়ে বৈঠক করার প্রস্তাব দিলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিসহ অন্য নেতারা একে স্বাগত জানান।

সার্ক রাষ্ট্রগুলোর জন্য ভারত গতকাল সুনির্দিষ্টভাবে ৯টি প্রস্তাব দিয়েছে। এর প্রথমটি হলো স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ‘কভিড-১৯’ (করোনাভাইরাস) জরুরি তহবিল সৃষ্টি। করোনাভাইরাসের মহামারি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তার লক্ষ্যে এই প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। সার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রসচিবরা এই প্রস্তাব ও তহবিল পরিচালনার নীতি চূড়ান্ত করবেন।

দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরঞ্জামসহ ভারত দ্রুত সাড়াদান দল প্রস্তুত রেখেছে। অন্য দেশগুলোর অনুরোধে তারা সহায়তা করতে প্রস্তুত।

তৃতীয়ত, ভারত সার্ক রাষ্ট্রগুলোর জরুরি সাড়াদানকর্মীদের অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত নিজে তার দেশে জরুরি সাড়াদানকর্মীদের অনলাইন প্রশিক্ষণের জন্য ওই ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে থাকে।

চতুর্থত, সার্ক রাষ্ট্রগুলোয় করোনা মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ও সেরা চর্চা বিষয়ে চিকিৎসক ও চিকিৎসা পেশাজীবীদের মধ্যে প্রতি সাত থেকে ১০ দিনে একবার করে ভিডিও কনফারেন্স আয়োজন।

পঞ্চম প্রস্তাব হিসেবে ভারত সার্ক অঞ্চলের মধ্যে ভ্রমণ বিধিনিষেধের প্রভাব বিবেচনার জন্য বাণিজ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্স করতে চায়।

ষষ্ঠ প্রস্তাব হিসেবে ভারত সার্কের সব ভাষায় তথ্য-উপাত্তসংবলিত ওয়েবসাইট প্রণয়নে সহায়তার কথা বলেছে। এ ছাড়া ভারত সমন্বিত স্বাস্থ্য তথ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সার্কের সব অংশীদারের মধ্যে রোগ বিস্তার নজরদারির লক্ষ্যে সফটওয়্যার প্রদান ও প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছে।

অষ্টম প্রস্তাবে ভারত কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সেরা চর্চা চিহ্নিত ও তা জনপ্রিয় করতে সার্ক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রকে কাজে লাগানোর কথা বলেছে। নবম প্রস্তাবে রোগ ও সংক্রামক মহামারি রুখতে সার্ক দেশগুলোর জন্য গবেষণা প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি করতে বলেছে। এটি সমন্বয়ে ভারতের চিকিৎসা গবেষণা কাউন্সিল কাজ করবে বলে মোদি জানিয়েছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় তাঁর দেশের উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন,  ‘প্রস্তুতি, তবে আতঙ্ক নয়’—এই হলো তাঁদের মূল মন্ত্র। বিদেশ থেকে ভারতে ঢোকার সময় যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিভিশন, পত্রিকা ব্যবহার করে জনসচেতনতায় প্রচারণা চালানো, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে বিশেষ প্রচেষ্টা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতা বৃদ্ধি ও প্রতিটি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন মোদি। তিনি বলেন, ভারত বিভিন্ন দেশ থেকে কেবল প্রায় এক হাজার ৪০০ ভারতীয়কেই ফিরিয়ে আনেনি, ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতির আলোকে প্রতিবেশী দেশগুলোর বেশ কয়েকজন নাগরিককেও উদ্ধার করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনের উহান থেকে ২৩ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যসচিব পর্যায়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কারিগরি বৈঠকের প্রস্তাব দেন। শেখ হাসিনা করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশের উদ্যোগ ও প্রস্তুতি অবহিত করেন।

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি বলেন, তাঁর দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ইরানের সঙ্গে উন্মুক্ত সীমান্ত। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে টেলিমেডিসিনসহ বিভিন্ন নিবিড় সহযোগিতার প্রস্তাব দেন।

মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় তাঁর দেশকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার জন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানান। তিনি করোনাভাইরাসের কারণে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে অর্থনৈতিক প্যাকেজ ও পুরো অঞ্চলের জন্য ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তাব দেন।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে কঠিন এই সময়ে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সার্ক নেতাদের একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেন। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সার্ক নেতাদের সম্মিলিত প্রয়াস চালানোর ওপর জোর দেন। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং বলেন, মহামারির কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। মহামারি মোকাবেলায় সব দেশের একসঙ্গে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জাফর মির্জা সার্ক দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সার্ক সচিবালয়কে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি করোনাভাইরাস মোকাবেলায় কৌশল নির্ধারণে সার্কের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনলাইন বৈঠকের প্রস্তাব দেন। এর দুই দিনের মাথায় গতকাল এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। ২০১৪ সালের নভেম্বরে নেপালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের পর সার্কের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের এটিই প্রথম আলোচনা।

সার্ক নেতারা নিজ নিজ দেশের দপ্তর থেকে গতকাল ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে বড় পর্দায় ওই ভিডিও কনফারেন্স সরাসরি দেখানো হয়। ওই ভিডিও কনফারেন্স দেখতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সমবেত হয়েছিলেন।

ভিডিও কনফারেন্স শেষে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস সাংবাদিকদের বলেন, করোনাভাইরাসের অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভারত এই অঞ্চলে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিল। করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক ঝুঁকি বেশ বড় হবে। সার্ক নেতারা এমনটিই বললেন।

রিভা গাঙ্গুলি বলেন, সার্ক অঞ্চলে দেড় শটির মতো সম্ভাব্য করোনা সংক্রমণের ঘটনা আছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ সবাই বলেছেন যে এতে (সংখ্যা অন্য অঞ্চলের চেয়ে কম) আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা প্রয়োজন। তাই সম্মিলিত উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।