দখিনা অনুসন্ধান: ওষুধ বিক্রিতে ব্যাপক জালিয়াতি ও অনিয়ম অবৈধ চিকিৎসা-বাণিজ্যে অসহায় মানুষ

0
481

দখিনা অনুসন্ধান(৩৮)

ওষুধ বিক্রিতে ব্যাপক জালিয়াতি ও অনিয়ম অবৈধ চিকিৎসা-বাণিজ্যে অসহায় মানুষ

সাইদ সবুজ

রক্ত সংগ্রহের সময় রক্তদাতার শারীরিক সুস্থতার পরীক্ষা, মাদকসেবীদের রক্ত সংগ্রহ না করা, রক্তদাতার পরিচয় ও স্বাস্থ্য রিপোর্টের রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকলেও অধিকাংশ ব্লাড ব্যাংক এসব মানে নাস্বাস্থ্যসম্মত নয় এমন ঘর, মনগড়া রিপোর্ট ও রক্ত সংগ্রহ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যসংবলিত লেবেল লাগিয়ে দেয়া হয় রক্তের ব্যাগেএইডস, এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়া আছে কিনা তা পরীক্ষা করে রক্ত সরবরাহের নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ব্লাড ব্যাংক এ নির্দেশনা অনুসরণ করে নাএছাড়া স্যালাইন মিশিয়ে এক ব্যাগ রক্তকে দুই ব্যাগ বানিয়ে মুমূর্ষু রোগীদের সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেরক্তের অপ্রতুলতার কারণে জরুরি প্রয়োজনে এসব রক্ত কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীর আত্মীয়-স্বজনজেনে না জেনে স্বাস্থ্যঝুঁকির কবলে পড়ছেন তারা

সরকারের অপর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবার কারণে সুযোগ নিচ্ছে এক ধরণের মুনাফালোভী মানুষ। এই মুনাফালোভীদের মধ্যে রয়েছে বহুত রথী মহারথী থেকে শুরু করে সরকারি হাসপাতালের তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পর্যন্ত। সরকারিভাবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দিতে পারায় বেসরকারিভাবে গড়ে উঠেছে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ব্লাড ব্যাংক, চক্ষু চিকিৎসালয়, আয়ুর্বেদিক ও হোমিও চিকিৎসালয়সহ বৈধ- অবৈধ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। এই সবগুলোর মাধ্যমে প্রতিমুহুর্তে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ রোগীসহ রোগীর নিকট আত্মীয়রা। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই সব অর্থলিপ্সু কতিপয় ব্যক্তিরা আরও বেশি সুযোগ নিচ্ছে। অনুসন্ধানে উঠে আসা চিকিৎসা সম্পর্কিত বাণিজ্যের কয়েকটি চিত্র তুলে ধরা হলো।

ব্লাড ব্যাংকে মাদকসেবীদের রক্ত বেচাবিক্রি

চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ ব্লাড ব্যাংক। চট্টগ্রাম মহানগরীতে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রক্ত নিয়ে অবৈধ ব্যবসা করছে ২০ জনের একটি সিন্ডিকেট। ব্লাড ব্যাংক করতে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন থাকলেও অবৈধভাবে বাণিজ্য করছে ১৪ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান। বিপজ্জনক পেশাদার রক্তদাতা (ডোনার) কিংবা মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের রক্ত কিনে ওই ব্লাড ব্যাংকগুলো। আর বিভিন্ন রোগীকে দেয়া হচ্ছে জীবাণুবাহী দূষিত রক্ত। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন ২০০৮ অনুযায়ী, ব্লাড ব্যাংকগুলোতে রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদ, ল্যাব সহকারী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকা, রক্ত সংগ্রহও, সংরক্ষণ প্রণালী আধুনিক ও উন্নত হতে হবে। অথচ অনুমোদনহীন কেন্দ্রে এসবের বালাই নেই। তেমনি রক্ত সংগ্রহের সময় রক্তদাতার শারীরিক সুস্থতার পরীক্ষা, মাদকসেবীদের রক্ত সংগ্রহ না করা, রক্তদাতার পরিচয় ও স্বাস্থ্য রিপোর্টের রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকলেও অধিকাংশ ব্লাড ব্যাংক এসব মানে না। স্বাস্থ্যসম্মত নয় এমন ঘর, মনগড়া রিপোর্ট ও রক্ত সংগ্রহ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যসংবলিত লেবেল লাগিয়ে দেয়া হয় রক্তের ব্যাগে। এইডস, এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়া আছে কিনা তা পরীক্ষা করে রক্ত সরবরাহের নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ব্লাড ব্যাংক এ নির্দেশনা অনুসরণ করে না। এছাড়া স্যালাইন মিশিয়ে এক ব্যাগ রক্তকে দুই ব্যাগ বানিয়ে মুমূর্ষু রোগীদের সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। রক্তের অপ্রতুলতার কারণে জরুরি প্রয়োজনে এসব রক্ত কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীর আত্মীয়-স্বজন। জেনে না জেনে স্বাস্থ্যঝুঁকির কবলে পড়ছেন তারা।

চট্টগ্রামে বছরে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। চমেকসহ পাঁচটি ব্লাড ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বছরে সংগৃহীত রক্তের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশই দূষিত। নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষা করে রোগীর শরীরে রক্ত দেয়ার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এটি মানছে না।

সম্প্রতি অসুস্থ এক আত্মীয়ের জন্য রক্তের প্রয়োজন দেখা দিলে রক্ত যোগাড়ে প্রচুর বেগ পোহাতে হয় মন্তব্য করেন আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, ‘সরকারি ব্লাড ব্যাংকে অধিকাংশ সময়ে ব্লাড পাওয়া যায় না। রক্তের গ্রুপ মিলে এমন মানুষও যোগাড় করা সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকগুলোর দ্বারস্থ হতে হয়। এরা টাকা বেশি নিয়েও কোন ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই দুষিত রক্ত দিলে আমরা কোথায় যাব?’ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের পেশাদার রক্তদাতাদের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত বা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত। মূলত মাদকাসক্তরাই নেশার টাকা জোগাড় করতে রক্ত বিক্রি করে থাকে এসব ব্লাড ব্যাংকে। এরা রক্তবাহিত নানান রোগে ভোগে। এ রক্ত গ্রহণ করে রোগী সাময়িকভাবে সুস্থ হলেও দীর্ঘমেয়াদে রক্তবাহিত বিভিন্ন জটিল রোগ যেমন, এইডস, হেপাটাইটিস-বি ও সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর ও ফাইলেরিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হবার আশংকা থাকে। তথ্য সূত্রে জানা যায়, পেশাদার রক্তদাতাদের মধ্যে শতকরা ২৯ শতাংশ হেপাটাইটিস-বি ও ২২ শতাংশ সিফিলিস রোগে ভোগে। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া রোগীকে রক্ত দেয়ায় পরবর্তী সময়ে ৬০ দশমিক ১ শতাংশ রোগী হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া পেশাদার রক্তদাতাদের বেশিরভাগই পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং চার মাসের বিরতির বিষয়টি না মেনেই রক্ত বিক্রি করে বলে রক্তের অন্যতম উপাদান হিমোগ্লোবিন এদের দেহে কম থাকে। ফলে এক ব্যাগ রক্তে যতটুকু হিমোগ্লোবিন পাওয়ার কথা রক্তগ্রহীতা তা পায় না। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুর রহমান সিদ্দিক দখিনাকে বলেন, ‘সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে আমি (সিভিল সার্জন), ডেপুটি সিভিল সার্জন ও একজন মেডিকেল অফিসারসহ মোট তিনজনের মতো জনবল রয়েছে। ইচ্ছা থাকলেও এই জনবল নিয়ে কিছু করা সম্ভব হয় না।’ অবৈধ ব্লাড ব্যাংকগুলোর রক্ত নিয়ে বাণিজ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখানে শুধু মালিক বা কর্মচারীরা নয়, পরীক্ষা না করেও কর্মচারীরা যে চিকিৎসকের সিল ব্যবহার করে তারাও এর সাথে জড়িত। সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

এদিকে কিছুদিন আগে র‌্যাব-৭-এর উপ-অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার মো. নাজমুল হকের সহায়তায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট চট্টগ্রামের চকবাজার এবং জিইসির মোড়ে চট্টগ্রাম সিটি ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চালায়। কোন বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই চালু হয়েছে এ ব্লাড ব্যাংক। পেশাদার ডোনার ও মাদকাসক্তদের কাছ থেকে রক্ত কিনে শংকটাপন্ন রোগীদের কাছে বিক্রি করছিল তারা। এই ব্লাড ব্যাংকের পাশেই অবস্থিত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল। ওই হাসপাতালের রোগীদের জন্য এখান থেকে রক্ত দেয়া হচ্ছে। এছাড়া আশপাশের বেসরকারি ও সরকারি হাসপাতালে ওই বিপজ্জনক ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত বিক্রি করার প্রমাণ পায় মোবাইল কোর্ট। অভিযানের সময় দুই মাদকাসক্ত যুবকের দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে দেখেছে মোবাইল কোর্ট। প্রতি ব্যাগ রক্ত দুইশ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা করে ওই ব্লাড ব্যাংক ক্রয় করে। রোগীদের কাছে ওই রক্ত বিক্রি করা হয় ৫শ’ থেকে তিন হাজার টাকায়।

মাদকাসক্ত যুবকরা মোবাইল কোর্টকে জানায়, নেশার টাকা যোগাতে তারা রক্ত বিক্রি করছে। মোবাইল কোর্ট অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের মালিক মাজিদুল ইসলাম রুবেল ও স্বরূপলামকে দুই বছর করে কারাদ- এবং দেড় লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও তিন মাস কারাদ- দেয়।

সীমিত কিডনী চিকিৎসায় ভোগান্তি

প্রতি বছর কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চট্টগ্রামে এখনো এ রোগের চিকিৎসার আধুনিক সুযোগ সুবিধা গড়ে ওঠেনি। ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণে চট্টগ্রামে বছরে মারা যায় কমপক্ষে ৫ হাজার কিডনি রোগী। চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশন পরিচালনা কমিটির সদস্য আবুল কাসেম দখিনাকে জানান, বর্তমানে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ কিডনি রোগী রয়েছে। সেই হিসেবে চট্টগ্রাম শহরে ৫০ লাখ লোকসংখ্যা ধরলে কিডনি রোগী হবে ৫ লাখ। এরমধ্যে প্রতি বছর ৫০ হাজার লোকের কিডনি ফেলিওর হয়। কিন্তু ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ, হাসপাতাল ও জনসচেতনতার অভাবে মাত্র দেড় হাজার থেকে দুই হাজার রোগী ডায়ালাইসিসের সুযোগ পায়।

অন্যরা চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। যারা ডায়ালাইসিস করতে আসে তাদের মধ্যে থেকেও প্রতি তিন মাস পরপর ছিটকে পড়ে অর্ধেক রোগী। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধার না থাকায় বেসরকারিভাবে ডায়ালাইসিস করতে প্রায় দ্বিগুণ-তিনগুণ খরচ পড়ে যায়। এতে করে কিছুদিন চিকিৎসা করার পর রোগী বা তার স্বজনের পক্ষে ব্যায়ভার বহন করা আর সম্ভব হয় না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে প্রফেসর ডা. ইমরান বিন ইউনুস এর নেতৃত্বে একদল চিকিৎসক চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে নগরীর ঘাটফরহাদবেগ এলাকার বাসিন্দা মাহবুবুর রহমানকে পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস প্রদান করে যে পথ চলার সূচনা করেন তাকে এগিয়ে নিয়ে ২০০৮ সালে পশ্চিম পটিয়ার জনৈক আব্বাস উদ্দিনের মায়ের দেয়া একটি কিডনি তাঁর দেহে প্রতিস্থাপিত করে চট্টগ্রামে ট্রান্সপ্লান্ট নেফ্রোলজির সূচনা করেন প্রফেসর ডা. দীপ্তি চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল চিকিৎসক ও সার্জন। এর আগে একই চিকিৎসক দল একই হাসপাতালে রাঙ্গুনিয়ার প্রবীর দাশের কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করেন। তবে এক বছর পর মারা যান প্রবীর দাশ। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে এবং সরকারের নীতিমালার কারণে দীর্ঘ ৮ বছরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আর কোন রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়নি।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরের মেশিনের মাধ্যমে আধুনিক ডায়ালাইসিসের সূচনা করে ১৯৮৭ সালে নগরীর হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল। এরপর পর্যায়ক্রমে চালু হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম সিএমএইচ, চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হসপিটাল, নৌবাহিনী চিকিৎসা কেন্দ্র, বন্দর হাসপাতাল, সেন্টার পয়েন্ট, সিএসসিআর, সার্জিস্কোপ, মেডিকেল সেন্টার, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, একুশে হাসপাতাল, ডেল্টা মেডিকেল সেন্টার, সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশন, আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক ডায়ালাইসিস সেন্টার, লায়ন্স সিতারা এমদাদ কিডনি সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল। কিন্তু যে হারে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, সে হারে বাড়েনি হাসপাতালের সংখ্যা। এছাড়া ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণে প্রকৃত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। তাছাড়া সরকারি হাসপালের তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালে ডায়োইসিসের খরচ প্রায় দ্বিগুণের অধিক।

এ বিষয়ে কিডনি বিভাগের ডায়ালাইসিসি যন্ত্র পরিচালনাকারী শওকত ওসমানের সাথে কথা বলে যানা যায়, চমেক হাসপাতালে বর্তমানে ডায়ালাইসিস মেশিন রয়েছে ১০টি তার মধ্যে একটি বিকল হয়ে আছে। আর বাদ-বাকী ৯টি মেশিন দিয়ে দুই তিন সেশন করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার কাছে সরকারিভাবে ডায়ালাইসিসে খরচ সম্বন্ধে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের এখানে দুই ধরণের ব্যবস্থা রয়েছে। একটি ৬ মাস মেয়াদী প্রিমিয়াম সেটিতে খরচ পড়ে ২০ হাজার টাকা আর একটি যারা হাসপাতালে ভর্তি আছে তাদের জন্য প্রতি ডায়ালাইসিসে ২০০ টাকা করে খরচ পড়ে। অথচ বেসরকারি হাসপাতালে এর খরচ পড়ে প্রতি ডায়ালাইসিসে তিন হাজার থেকে তিন হাজার পাঁচ’শ টাকা। এতো কিছুর পরও আশার বাণী হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্বে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগে ৪৪টি নতুন ডায়ালাইসিস মেশিন স্থাপন করা হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ডায়ালাইসিসের জন্য সিরিয়াল পেতেই রোগীদের মাসের পর মাস চলে যায়। এতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের কিডনি নষ্ট রোগীদের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি রোগীরা ক্লিনিকের চেয়ে কম খরচে উন্নত চিকিৎসা পাবেন বলে আশা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গণি বলেন, ‘এটি পুরোদমে চালু হলে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৩৫ টি সেশনের মতো এখানে আমরা দিতে পারবো।’ কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘এই ব্যাপারে পিপিপি প্রজেক্ট বিরাট একটি সাহায্য করবে আমাদের। এখানে কিছু রোগী প্রি-ডায়লাইসিস পাবে, আবার কিছু আবার কম মূল্যে সেবা পাবে।’

চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি এম আমিনুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, ‘পৃথিবীতে আজ কিডনি দুর্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের মত দেশও তা থেকে মুক্ত নয়। তবে কিডনি রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমেই অনেকের জীবন বাঁচানো সম্ভব। সেচ্ছাসেবী সংগঠন কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) এর সভাপতি ডা. এম এ সামাদ বলেন, ‘দেশে প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। আর এই রোগে প্রতি ঘন্টায় অন্তত ৫ জন করে মৃত্যুবরণ করছে। কিডনি রোগ অত্যন্ত ভয়াবহ। এ রোগের চিকিৎসা এতই ব্যয়বহুল যে, এ দেশের শতকরা ৫ ভাগ লোকের এ রোগের চিকিৎসা চালানো সম্ভব নয়’।

ওষুধ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম

সরেজমিন দেখা যায়, চট্টগ্রামের বাজারগুলোতেও অবাধে চলছে রেজিস্ট্রেশনবিহীন দেশি-বিদেশি ঔষুধের রমরমা ব্যবসা। পাইকারী আর খুচরা প্রায় সব দোকানেই মিলছে নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। ভেজালবিরোধী অভিযান চললেও থেমে নেই অবৈধভাবে আমদানি করা বিদেশি ওষুধ কিংবা রেজিস্ট্রেশনবিহীন দেশি ওষুধ কোম্পানির লাগামহীন ব্যবসা। চট্টগ্রামে ওষুধের সবচেয়ে বড় পাইকারী বাজার চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার হাজারী গলি। এ গলিতে রয়েছে প্রায় সাড়ে চারশ ওষুধের দোকান। এসব দোকানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বিকিকিনি হয়। পাশাপাশি রয়েছে নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের গুদাম। এসব ওষুধ বিক্রির জন্য আছে প্রায় পঞ্চাশ জনের একটি সিন্ডিকেট। প্রশাসনের ভিতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ভেজাল ওষুধের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই পাচার করে দেয় অভিযানের খবর। ফলে হঠাৎ করেই দেখা যায় প্রায় সব দোকান বন্ধ করে ব্যবসায়ীরা চলে যান অন্য কোথাও। বিপাকে পড়েন মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্যরা। রেজিস্ট্রেশনবিহীন কোম্পানিসহ অনুমোদনহীন বিদেশি ওষুধ দেদার বিক্রি হলেও স্বীকার করেন না কেউই। ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালালেও অনেক সময় প্রশাসনের লোকজনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও ইট পাটকেল ছুঁড়ে মারার ঘটনা ঘটে এখানে।

এছাড়া আটা-ময়দা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভিটামিন! আবার অনেক আয়োজন এসব ভিটামিন বাজারজাতও হচ্ছে। এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে চট্টগ্রামের নামিদামি ডাক্তারদের। তারা রোগীর প্রেসক্রিপশনে লিখছেন বেনামি কোম্পানির ভিটামিন। রোগীরাও ডাক্তারের ওপর আস্থা রেখে কিনছেন এসব ভিটামিন। প্রতারিত হচ্ছেন মনের অজান্তে। অথচ ফুড সাপ্লিমেন্ট ডাক্তারদের প্রেসক্রাইব করার নিয়ম নেই। আবার ফার্মেসিতেও এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রির ওপর আছে বিধিনিষেধ। চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসন ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযানে বেনামি কোম্পানির ৫০ কার্টন ভিটামিন জব্দ করা হয়। অভিযানে জব্দ করা এসব ওষুধের কৌটার ওপর লেখা মেড ইন মালয়েশিয়া-ভারত-চীন ও দেশের মুন্সীগঞ্জ, ঢাকার পুরানা পল্টনসহ আরও নানা স্থানের নাম। এ ছাড়াও এসব ভিটামিনের কৌটায় লেখা নেই উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের কোনো তারিখ। কেবল দামটিই লেখা আছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন দশকের বেশি পুরনো নীতিমালা দিয়ে চলছে দেশের বিকাশমান ওষুধশিল্প। গত কয়েক বছরে এ শিল্প দ্রুত বিকশিত হলেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওষুধনীতির আধুনিকায়ন করা হয়নি। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেশীয় বাজারে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ সহজে ঠাঁই করে নিচ্ছে। রোধ করা যাচ্ছে না লাগামহীন উচ্চমূল্য। পুরনো নীতিমালার বাধ্যবাধকতায় ওষুধের মান ও কার্যকারিতা নিয়েও ক্রেতারা কোনো তথ্য জানতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, যুগোপযোগী নীতিমালা না থাকায় দেশজুড়ে ওষুধ বাণিজ্যে চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য। এছাড়া ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নানা অজুহাতে অব্যাহতভাবে ওষুধের দাম বাড়িয়ে চলেছে। অথচ তদারকি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ওষুধের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা নেই। ফলে উৎপাদিত বেশিরভাগই ওষুধই রয়ে যাচ্ছে তদারকির বাইরে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ৩শ আইটেমের ২৫ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ রয়েছে। তা থেকে মাত্র ২০৯টি আইটেম রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায়। এসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বাইরে অন্য ওষুধের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের নেই। বরং ওষুধ কোম্পানিগুলোই তাদের ইচ্ছেমতো উৎপাদিত ওষুধের দাম নির্ধারণ করছে।

ওষুধের পাতার গায়ের ওপর বড় করে লেখা আছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সম্পত্তি। ক্রয়-বিক্রয় আইনত দন্ডনীয়।’ অথচ সরকারের বিনামূল্যের এসব ওষুধ বিক্রি হচ্ছে  চট্টগ্রামের বেসরকারি ফার্মেসিগুলোয়। গত তিন মাসে নগরীর ৯৫টি ওষুধের দোকানে অভিযান চালিয়ে ৮৯টিতেই সরকারি ওষুধ পেয়েছেন জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গত ৮ জুলাই থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকায় ৯৫টি ফার্মেসিতে অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর মধ্যে ৮৯টিতে সরকারি ওষুধ পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানকে ৯ লাখ সাড়ে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কারাদন্ড দেয়া হয়েছে তিন দোকানিকে। ২১টি ফার্মেসি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নের্তৃত্বে দিচ্ছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রুহুল আমীন। এ আদালতে ওষুধ প্রশাসন চট্টগ্রামের কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন ও সিভিল সার্জনের প্রতিনিধিরাও থাকছেন।

এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আশপাশে কয়েকটি ফার্মেসিতে সরকারি ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে নগরের যে এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে, সেখানেই মিলছে সরকারি ওষুধ। প্রায় ফার্মেসিতেই সরকারি ওষুধ পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’ গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কার্যলয়ে “চট্টগ্রাম জেলায় ওষুধ ব্যবসা সূষ্ঠভাবে পরিচালনার নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্পৃক্ততা” বিষয়ক সমন্বয় সভায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন  বলেন, সরকারি ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট এবং  স্যাম্পল, মেয়াদোত্তীর্ণ, অনুমোদনহীন ও লাইসেন্সবিহীন ওষুধ বিক্রির  ক্ষেত্রে অসৎ ডাক্তারদের কারসাজি রয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ ওষুধ বিক্রিতে ফার্মেসির মালিকের চেয়ে স্টাফরাই দায়ী বেশি।

তিনি আরো বলেন, “সরকারি ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট, ফিজিশিয়ান  স্যাম্পল, মেয়াদোত্তীর্ণ, অনুমোদনহীন, লাইসেন্সবিহীন ওষুধের অবৈধ বিক্রি ঠেকাতে জেলাপ্রশাসনের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এ ধরণের ওষুধ  ক্রয়ের ক্ষেত্রে জনগণকে সচেতন হতে হবে।” মেজবাহ উদ্দিন বলেন, অবৈধ ওষুধ বিক্রি ঠেকাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচলকদের সাথে শীঘ্রই পৃথক বৈঠকে বসবে জেলা প্রশাসন। সরকারি ওষুধ জনকল্যাণে বিতরণ করার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয়। কিন্তু বাজারে সরকারি ওষুধ পাওয়ার ক্ষেত্রে অসাধু ডাক্তাদের হাত থাকে। জনগণকেও সরকারি ওষুধ  ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্তক থাকতে হবে।” চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ, নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির মাধ্যমে অসাধু ফার্মেসিগুলো জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। এছাড়া সরকারি ওষুধ  ক্রয় বিক্রয় উভয়ই অপরাধ। সরকারি ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় ঠেকাতে ফার্মেসি মালিকরা বেশি ভুমিকা রাখতে পারেন।

বাংলাদেশ কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্টস সমিতি’র চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি বলেন, ডাক্তারদের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ফার্মেসিগুলো রোগীদেরকে ওষুধ সরবরাহ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সরকারি কিংবা বেসরকারি ওষুধ কোন দিকই বিবেচনা না করে ভ্রাম্যমান আদালত  এলোপাথাড়ি অভিযান পরিচালনা করছে।

এ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্যে জিম্মি মানুষ

বন্দর নগরী চট্টগ্রামে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে চরম বেহালদশা নানামুখী অভাব, সমস্যা-সংকট, সীমাবদ্ধতা আরেকটি চিত্র অপর্যাপ্ত এ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা। প্রতিদিনই অসংখ্য রোগীর চাহিদার তুলনায় সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত এ্যাম্বুলেন্স কয়েছে। এ কারণে রোগীদের অনেক বেগ পোহাতে হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কেন্দ্রীক কয়েক ধরণের দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিছু দালাল এ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্যের সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত। তারা সংকট এবং রোগীদের অসহায়তা একসাথে কজে লাগিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। আর এই দালাল চক্রের সাথে যোগসাজস এ্যাম্বুলেন্স চালকদের। এতে করে রোগী এবং মৃত লাশ পরিবহনের ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স চালকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন রোগীর স্বজনরা। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে হয়ে। দখিনার প্রতিবেদক অনুসন্ধান করে জানতে পারে, যেখানে সাধারণ ভাড়া ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা সেখানে এ্যাম্বুলেন্স ব্যরসায়ীরা ভাড়া হাঁকাচ্ছে ৪০০০ থেকে ৪৫০০ টাকা। এছাড়া ক্ষেত্র এবং সময়ভেদে ভাড়া আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

নানা ভোগান্তিতে রোগীরা, দালালদের দৌরাত্ব

রাত সাড়ে এগারোটায় আবদুল মজিদ স্ত্রীর জন্য অপারেশন সুতা কিনতে এসেছেন মেডিকেলের সামনের ওষুধের দোকানে। তিনশ’ টাকার সুতা সাড়ে চারশ’ টাকা। পাশের দোকানে দেখা যায় ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে চলছে তুমুল বাক্য বিনিময়। কারণ ৪৮ টাকার সিরাফ নাকি ৬০ টাকা। কিনতে এসেছেন ম্যাগনেশিয়াম হাইড্রোক্সাইড। অধিকাংশ মানুষের কাছে মিল্ক অব ম্যাগনেশিয়া নামে পরিচিত এ সিরাপ সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। সম্প্রতি সিরাপটির দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিয়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলো। ফলে ভোক্তাদের চড়া দামে কিনতে হচ্ছে তা। শুধু ভোক্তারা নন, ওষুধটির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে অনেক দোকানিও হতাশ। খুচরা ওষুধ বিক্রেতারা জানিয়েছেন, দুই বছরের ব্যবধানে ম্যাগনেশিয়াম হাইড্রোক্সাইডের দাম প্রায় চার গুণ বাড়ানো হয়েছে। দুই বছর আগে ১০০ মিলিলিটার ম্যাগনেশিয়াম হাইড্রোক্সাইড সিরাপের দাম ছিল ১৫ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ২৮-৩০ টাকা করা হয়। ছয় মাস ধরে এ ওষুধের দাম আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৫৮-৬০ টাকা রাখা হচ্ছে। এতে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রায়ই তাদের বাদবিবাদ হয়।

আমেনা বেগম, বয়স ৫০। জটিল রোগে আক্রান্ত। পরিবারের লোকজন নিয়ে এসেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। ভর্তি করানো হয় জরুরি বিভাগে। ভর্তির আগেই পেছনে নিয়েছে এক ওয়ার্ড বয়। নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে অনর্গল। রোগীকে ট্রলিতে তুলার জন্য এক সহকর্মীকে ডেকে নেয় সে। বকশিস হিসেবে চাইল ১০০ টাকা। শুধু তাই নয় বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে চাইল আরো কিছু অর্থ। নিজেরা তেমন জানে না বলে রোগীর স্বজনরা প্রস্তাবে  রাজি। তাদের মধ্যে এক প্রকার সমঝোতা হয়ে গেল। সেই ওয়ার্ড বয় যেন কোথায় উধাও! দশ মিনিট মিনিট ধরে আর দেখা নাই।

বেলা বারোটায় চমেকের মূল ফটকের গেইটে দেখা যায় কিছু মানুষের জটলা। ব্যাপার কি? জানা যায় এক ব্যক্তি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তিন ব্যক্তিকে এক ল্যাবের গুণাগুণ বয়ান করছে। সুলভে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষার কথা উপস্থাপন করছে। পরীক্ষায় ছাড়ের কথাও বলছে। জানতে চাইলে কোন ল্যাব, এড়িয়ে যান। এটা তো আমাদের বিষয়। আপনি শুনছেন কেন?

এসব খন্ড চিত্র নয়, প্রতিনিয়ত রোগী ও স্বাস্থ্য সেবাপ্রত্যাশী মানুষ প্রতিনিয়ত নানান ধরণের ভোগান্তি আর দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালগুলোয় প্যারাসিটামল জাতীয় ছাড়া দামি কোনো ওষুধ দেয়া হয় না। চিকিৎসকদের তালিকা অনুযায়ী, বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয় তাদের। জেলা ও নগরের সব হাসপাতালেই একই অবস্থা। অথচ ফার্মেসিতে কিনতে গেলেই অনেক সময় লাল-সবুজের সরকারি ওষুধ গছিয়ে দেয়া হয়। হাসপাতালগুলোর একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, নার্স, তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা বিনামূল্যের ওষুধ ফার্মেসিতে সরবরাহ করেন।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন না থাকলে চিকিৎসক সংকট, অধিক রোগীর ভার,  নানান অব্যবস্থাপনা, অর্থলোভী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দৌরাত্ম আর প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের দালালদের তৎপরতা সেবাপ্রত্যাশীদের রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে রোগীকে আরো ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। চট্টগ্রামের শহরে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে অতি মুনাফামুখিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ডাক্তারদের প্রাইভেট রোগী দেখা  হতে শুরু করে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নানান রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়, ল্যাব টেস্ট, অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও ওষুধ ক্রয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে রোগী ও রোগীর স্বজনদের হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়। প্রতি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নেই দৃশ্যমান সেবার মূল্য তালিকা। যার কাছ থেকে যেমন পারে তেমন বিল আদায় করে। অধিকাংশ ল্যাবগুলোতে নেই দৃশ্যমান মূল্য তালিকা। নেই গরীবদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। আছে সেবার নামে উচ্চমূল্য গ্রহণের প্রবণতা।

চট্টগ্রাম মহানগরে জুড়ে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা অসংখ্য মানহীন ও অনুমোদনহীন রোগ নির্ণয়কেন্দ্রগুলোর স্বাস্থ্যসেবার নামে বৃদ্ধি করছে জনদুর্ভোগ। একধরণের অসাধু চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মচারীদের যোগসাজশে আর মুনাফালোভী কিছু ব্যবসায়ীদের কারণে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে চলছে রমরমা ব্যবসা ও অনিয়ম। তাছাড়া তাদের দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রতারণা শিকার হচ্ছে সহজ-সরল-সাধারণ-দরিদ্র মানুষগুলো।  এসব সেন্টারের একদিকে যেমন নেই সংশ্লিষ্ট দফতরের কোন অনুমোদন, নিজস্ব ভবন, একইভাবে নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দক্ষ জনবল। নেই তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম।

চট্টগ্রাম মহানগর ও চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় এক হাজারও অধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। কিন্তু চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায় পুরো জেলায় ৩৪৩টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন আছে। আর বাকিগুলো অবৈধ ও অনুমোদনহীনভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। যত্রএত গড়ে ওঠা অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার রমরমা বাণিজ্য চালাছে অসাধু ডাক্তারদের লোভনীয় কমিশন প্রদানের মাধ্যমে। এ কমিশনের হার ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। ডাক্তার ও দালালদের কমিশন নিশ্চিত করা হলেও নিশ্চিত করা হয় না রোগীদের নির্ভুল রিপোর্ট। কারণ,  সার্বক্ষণিক ডাক্তার ও টেকনোশিয়ান না থাকা, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বৃদ্ধি, অল্প সময়ে অধিক রিপোর্ট ও দ্রুত প্রদানের চেষ্টা, নমুনা সংগ্রহের আইডি নম্বর প্রদানের অসতর্কতা, প্যাথলিজিস্টের খামখেয়ালিপনাসহ বাহিরে থেকে পরীক্ষা রিপোর্ট সংগ্রহ করে দেয়া। এসব কারণে রোগীদের দেয়া হচ্ছে ভুল রিপোর্ট। ফলে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দখিনা ৩৮ অনুসন্ধান: