আস্থাহীন স্বাস্থ্যসেবায় বাড়ছে বিদেশমুখিতা : বিপুল অর্থ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে

0
413

বিশেষ প্রতিবেদন

আস্থাহীন স্বাস্থ্যসেবায় বাড়ছে বিদেশমুখিতা : বিপুল অর্থ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে

সাইফ উল আলম

চিকিৎসা সেবা গ্রহণে ভারতগামী একাদিক সেবাপ্রত্যাশীদের আলাপ করে জানা যায়, টাকায় নয়, সেবার মান, আস্থা ও সন্তুষ্টিই জরুরিতাদের অভিযোগ-দেশের বেশি ভাগ চিকিৎসক রোগী ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে দুর্ব্যবহার করেনকেউ কেউ ছোট খাটো বিষযে রোগীদের ধমক দিতেও দ্বিধা করেন নাঅধিকাংশ চিকিৎসকরা পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার অভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় ভুল করেনআর ভুলে মাশুল দিতে হয় রোগীকে জীবন দিয়েএছাড়া অল্প সময়ে অধিক রোগী দেখা, বেশি টাকা ব্যয় করেও যথাযথ চিকিৎসা সেবা না পাওয়া যদিও ক্ষেত্রে বিশেষ করে অল্প টাকায় যথাযথ সেবা পাওয়া যায়, পাশাপাশি এক গাদা টেস্ট পরীক্ষা বিড়ম্বনা তো আছেসাথে যুক্ত হল অযোগ্যদের চিকিৎসক হওয়ার আগামীর ঝুঁকি

স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই এখন রোল মডেল। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত একাধিক লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হয়েছে বাংলাদেশ, যার জন্য পুরস্কারও লাভ করেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, স্বাস্থ্যসেবা প্রসারের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে সমর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। অপরদিকে দক্ষ ও যোগ্য চিকিৎসকের অভাব, জটিল ও বিশেষক্ষেত্রে মানসম্মত হাসপাতালের অভাব, অতিমূল্য ও ভেজাল ওষুধের বাজার, মানহীন ল্যাবগুলোর ভুল ও মানহীন রির্পোট, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অতি মুনাফার ফাঁদ ইত্যাদি সহ বিদ্যামান নানান কারণে দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত দেশের চিকিৎসা সেবার উপর আস্থা হারাচ্ছেন, রাষ্ট্রপতি হতে প্রান্তিক কৃষক পর্যন্ত। এছাড়া অর্থনৈতিক বিকাশ ও রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে ওঠার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা। সাধারণ থেকে জটিল রোগের চিকিৎসা ব্যয় বেশি এবং দেশের চিকিৎসা সেবায় আস্থাহীনতায় ব্যাপক মানুষ বাংলাদেশ হতে প্রতি বছর চিকিৎসা নেওয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছুটে যাচ্ছেন। যা এ দেশের স্বাস্থ্যসেবার দৈন্যদশাই তুলে ধরে।

কেউ কোনো রোগে আক্রান্ত হলে আত্মীয়-স্বজন-পরিচিত-অপরিচিতদের পরামর্শ থাকে- দেশের বাহিরে নিয়ে যেতে বিশেষ করে পাশের দেশে ভারতে। পাশাপাশি  উচ্চ মধ্যবিত্ত প্রতিনিয়ত উন্নত চিকিৎসার জন্য মালয়শিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ব্যাংকক, লন্ডন, আমেরিকায় ছুটে যাচ্ছেন হরহামেশা।

চট্টগ্রাম কিংবা বাংলাদেশ থেকে কত সংখ্যক মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশ যাচ্ছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কোথাও। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে, ভিসাপ্রার্থী বিদেশগামীদের সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভভাবে আলাপ করে ধারণা করা যায়, প্রতিবছর চট্টগ্রাম হতে এক লাখ হতে এক লাখ বিশ হাজার মানুষ বিদেশ যাচ্ছে চিকিৎসা সেবা নেওয়া জন্য। আর সারা বাংলাদেশে এর পরিমাণ সাড়ে তিন লাখ। এতে দেশের ছয়’শ কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে এর মধ্যে প্রতিবেশী ভারতে যাচ্ছে ৮০-৮৫ শতাংশ। প্রতিবেশী এ দেশটিতে চিকিৎসাসেবার মান উন্নত এবং তুলনামূলক কম ব্যয়ের কারণে মানুষ পূর্ণ আস্থা নিয়ে  ছুটছেন ভারতের বিভিন্ন শহরে এবং ফিরছেন সন্তুষ্টচিত্তে। শপিংও বাদ থাকছে না কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এখন মামুলি হাম-জ্বরের মত হয়ে যাওয়া বাইপাস সার্জারির জন্য কেন রোগীরা ভারতে যাবে কিংবা পিত্তথলির পাথর অপারেশনের মত সাধারণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে কেন বিমানভাড়া দিয়ে সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ড যাচ্ছেন ব্যবসায়ী-আমলারা? এসব প্রশ্নের উত্তর  হয়তো খোঁেজ না সরকার, ডাক্তার বা হাসপাতালের মালিকরা। তবে রোগীদের কাছে আছে যৌক্তিক উত্তর।

চিকিৎসা সেবা গ্রহণে ভারতগামী একাদিক সেবাপ্রত্যাশীদের আলাপ করে জানা যায়, টাকায় নয়, সেবার মান, আস্থা ও সন্তুষ্টিই জরুরি। তাদের অভিযোগ-দেশের বেশি ভাগ চিকিৎসক রোগী ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে দুর্ব্যবহার করেন। কেউ কেউ ছোট খাটো বিষযে রোগীদের ধমক দিতেও দ্বিধা করেন না। অধিকাংশ চিকিৎসকরা পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার অভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় ভুল করেন। আর ভুলে মাশুল দিতে হয় রোগীকে জীবন দিয়ে। এছাড়া অল্প সময়ে অধিক রোগী দেখা, বেশি টাকা ব্যয় করেও যথাযথ চিকিৎসা সেবা না পাওয়া যদিও ক্ষেত্রে বিশেষ করে অল্প টাকায় যথাযথ সেবা পাওয়া যায়, পাশাপাশি এক গাদা টেস্ট পরীক্ষা বিড়ম্বনা তো আছে। সাথে যুক্ত হল অযোগ্যদের চিকিৎসক হওয়ার আগামীর ঝুঁিক।

রোগ ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, দেশের ডাক্তারদের কাছে অর্থ উপার্জনই জীবনের চাওয়া-পাওয়া। তাই তারা প্রতিদিন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে গড়ে ৫০ জনের অধিক রোগী দেখেন। নামি ডাক্তারদের কেউ কেউ ঘন্টায় ২০ জন রোগী দেখেন। রোগীরা তার শারীরিক সমস্যার বিশদ জানাতে চাইলেও ডাক্তারের হাতে সে সময় থাকে না। কারণ তাঁর কাছে সময়ই অর্থ। ভিজিট বাবদ অর্থ তো পাওয়া যায় বিভিন্ন টেস্ট বাবদ কমিশন, বিভিন্ন কোম্পানি হতে উপহার। পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের ডাক্তারির পেশা খুবই লাভজনক। ফলে অন্য পেশার লোকদের চেয়েও কম ডাক্তার দেশ ছাড়েন। হাসপাতাল, প্রাইভেট প্র্যাকটিস, কনসালট্যান্সি করেই শেষ হয় ডাক্তারদের দিন। ফলে সময় থাকে না উচ্চ অধ্যয়ন এবং গবেষণার। ফলে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান ও জ্ঞান যুক্ত হচ্ছে দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থায়। চট্টগ্রাম মহানগরে জুড়ে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা অসংখ্য মানহীন ও অনুমোদনহীন রোগ নির্ণয়কেন্দ্রগুলোর স্বাস্থ্যসেবার নামে ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে জনদুর্ভোগ। এক ধরণের অসাধু চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মচারিদের যোগসাজশে আর মুনাফালোভী কিছু ব্যবসায়ীদের কারণে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে চলছে রমরমা ব্যবসা ও অনিয়ম। তাছাড়া তাদের দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রতারণা শিকার হচ্ছে সহজ-সরল-সাধারণ-দরিদ্র মানুষগুলো। এসব সেন্টারের একদিকে যেমন নেই সংশ্লিষ্ট দফতরের কোন অনুমোদন, নিজস্ব ভবন, একইভাবে নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দক্ষ জনবল। নেই তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু সাদা চোখের এ উন্নয়নের উল্টো চিত্র হলো কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন ও ক্যান্সারের মতো বহুমাত্রিক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। এদিকে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দের হার কমেই চলেছে। একই সময়ে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিৎসা খাতে ব্যক্তির পকেট থেকে (আউট অব পকেট) ব্যয়। ব্যক্তিগতভাবে স্বাস্থ্যব্যয় বহনে এশিয়ায় বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি বাধ্য হচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংকের তথ্যে প্রকাশ। রোগের বিস্তারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে সরকারের বাজেট সংকোচন ও ব্যক্তির ব্যয় বৃদ্ধি স্বাস্থ্যহীনতার চক্রেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পরিবর্তনশীল সময়ে প্রসারমান নতুন নতুন রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বিদ্যমান হাসপাতালের অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়ন এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্বাস্থ্যসেবার বিশেষায়ণ। এজন্য প্রয়োজন সরকারি বিনিয়োগ। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টো। স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় ক্রমেই কমছে। আবার বেসরকারি খাতেও পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে অনেকাংশে ব্যর্থ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ অন্যান্য ব্যাধির বিস্তার ঠেকাতে সার্বিকভাবে দেশের মানুষ স্বাস্থ্যহীনতায় আক্রান্ত হবে। স্বাস্থ্যহীন জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে পূর্ণ উৎপাদনশীলতা পাওয়া সম্ভব হয় না। ব্যষ্টিক পর্যায়েও স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যক্তির আয় হ্রাস পায়। এর প্রভাব পড়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর। সার্বিক অর্থনীতি ভালো না থাকলে উন্নত স্বাস্থ্য অবকাঠামো, খাদ্যাভ্যাস ও সচেতনতা বৃদ্ধি সম্ভব হয় না। এ প্রক্রিয়াগুলো চক্রাকারেই চলতে থাকে। বড় ধরনের বিনিয়োগ ছাড়া এ অশুভ চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন। আর এ ব্যর্থতার কারণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নাজুক ও আস্থাহীন হয়ে পড়ছে দিনে দিনে।

চট্টগ্রাম মেডিকলে কলেজের রেডিওথেরাপি বিভাগের সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগে এ বছর নতুন করে ৮০ হাজার মানুষ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। পুরাতন ক্যান্সার রোগী আছে আরো ৩ লাখ বিশ হাজার। সব মিলিয়ে মোট রোগীর সংখ্যা চার লাখ। কিন্তু এতো রোগীর মধ্যে মাত্র বছরে সেবা পায় মাত্র দুই হাজার হতে আড়াই হাজার রোগী। আর বাদ বাকী বিপুল জনগোষ্ঠী সরকারি চিকিৎসা সেবার বাহিরে। এছাড়া চট্টগ্রামে তেমন ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবার আওতার বাহিরে আছে। ফলে এসব রোগীর অধিকাংশ পুরোই অচিকিৎসায় মারা যায়। আর যাদের সক্ষমতা আছে তার বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করছেন। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, উন্নত চিকিৎসা মানুষ যেখানে পাবে, সেখানে তো যাবে। আর এটাই স্বাভাবিক।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনের দেখা যায়,  প্রতি বছর ভারতের চিকিৎসার জন্য ১২ লাখ বিদেশি আসছে। এ খাত হতে ১২০০ মিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে। আর ২০১৬ সাল শেষে তাদের স্বাস্থ্যখাতে মেডিকেল ট্যুরিস্ট হবে ৩২ লাখ আর আয় হবে দুই বিলিয়ন। আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভারতে আছে ডজনখানিক বিশ্বমানের হাসপাতাল। যেমন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স হাসপাতাল, এ্যাপোলো হাসপাতাল, ত্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, টাটা মেমোরিয়ার হাসপাতাল, লীলাবতী হাসপাতাল, বোম্বে হাসপাতাল। আর এসব হাসপাতালগুলোতে হৃদরোগ, কিডনী, লিভার, ক্যান্সার, মস্তিষ্ক ও মেরুদন্ডের চিকিৎসায় বেশি হয়। পাশাপাশি থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাড ইন্টারন্যাশনাল, ব্যাংকক হাসপাতাল ও ব্যাংকক অ্যাভনটিস হাসপাতাল। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ বাংলাদেশের এলিটদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

রোগটির বিস্তারে নানা কারণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা; যার প্রায় সবই মনুষ্য সৃষ্ট। এর মধ্যে বড় একটা কারণ তামাকজাত দ্রব্য সেবন। দেশে এখন প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে তামাকদ্রব্য সেবন করছে। পুরুষরা তামাকজাত দ্রব্য সেবন বা এর প্রভাবে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও তাই প্রশ্ন তুলছেন তারা।

দেশে ক্যান্সারে আক্রান্তের হার বেড়ে যাওয়ার আরো একটি কারণ অনিরাপদ খাবার গ্রহণ। কৃষিতে রাসায়নিক ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলছে। এর ওপর রয়েছে ফলমূল ও মাছে ফরমালিন ব্যবহার। বায়ুদূষণকেও ক্যান্সার বিস্তারের আরো একটি কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বায়ুদূষণ বিশেষ করে বাতাসে সিসার মাত্রা বৃদ্ধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রোগটির এত ব্যাপকতা সত্ত্বেও সরকারিভাবে চিকিৎসার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ক্যান্সারের চিকিৎসার একটি বড় অংশ এখনো ব্যক্তিগতভাবেই সেরে নিতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা গেছে, দেশে যেসব রোগের কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে, তার মধ্যে ষষ্ঠ প্রধান কারণ এই ক্যান্সার। আর রোগটির মোট চিকিৎসা ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বহন করছে ব্যক্তি তার নিজস্ব পকেট থেকে।

এপিক হেলথ কেয়ার লিমিটেডের চেয়্যারম্যান এসএম লোকমান কবির বলেন, দেশে বেশকিছু রোগের উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব হলেও ক্যান্সারের এখনো পূর্ণাঙ্গ সেবা দেয়ার জন্য হাসপাতাল তৈরি করা সম্ভব হয়নি। দেশে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান সেবাটি প্রদানের চেষ্টা করলেও মাত্রাতিরিক্ত রোগীর কারণে পরিপূর্ণ সেবা প্রদান করতে পারছে না।

চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যান্সারের রোগী স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, রোগটির প্রকোপ যে হারে বাড়ছে, সে অনুসারে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল তৈরি করে সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে দেশে বিপর্যয় নেমে আসবে।

‘সাউথ এশিয়ান জার্নাল অব ক্যান্সার’-এর আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩-১৫ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত। প্রতি বছর রোগ নির্ণয়ে নতুন করে দুই লাখ মানুষের মধ্যে ক্যান্সার ধরা পড়ছে।

গবেষণা বলছে, ক্যান্সার আক্রান্ত প্রতি দুই লাখ মানুষের জন্য দুটি রেডিও থেরাপি সেন্টারের প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে ক্যান্সারের প্রকোপ বাড়লে সারা দেশে ৩০০টি রেডিওথেপারি সেন্টারের প্রয়োজন হবে। কিন্তু দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মাত্র ১৭টি রেডিওথেরাপি সেন্টার রয়েছে। সারা দেশে বেড ক্যাপাসিটি রয়েছে মাত্র ৫০০টি; যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য।

জানা গেছে, মোট ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ৬০ শতাংশই পুরুষ। পুরুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৩ শতাংশই আক্রান্ত হচ্ছে ফুসফুসের ক্যান্সারে। অন্যদিকে ৩৩ শতাংশ নারীই ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া সার্ভিক্যাল ক্যান্সারে ২৬ শতাংশ ও লিপ অ্যান্ড ওরাল ক্যান্সারে প্রায় ৭ শতাংশ নারী আক্রান্ত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) বাসুদেব গাংগুলী বলেন, রোগটির পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। ক্যান্সার প্রতিরোধে সরকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা দ্বিগুন করেছে। এছাড়া দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আলাদা বিভাগ খোলা হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসায় উন্নত যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, গত এক যুগের ব্যবধানে হাইপারটেনশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। দেশে এখন প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে ভুগছে। একইভাবে দেশে বর্তমানে জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এছাড়া দেশে এখন প্রায় ১৫ লাখ ক্যান্সার রোগী রয়েছেন। আর ক্যান্সারের ঝুঁকিতে আছে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষ; ২০৩০ সাল নাগাদ যা উন্নীত হবে ২ কোটি ১৪ লাখে। এর বাইরে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী নৃতাত্ত্বিকভাবেই হৃদরোগপ্রবণ। যুক্তরাজ্যের একটি সমীক্ষায়ও সে দেশে হৃদরোগে সবচেয়ে ঝুঁকিপ্রবণ হিসেবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা চিহ্নিত হয়েছেন।

দেশে হাইপারটেনশনের ব্যাপকতার চিত্র উঠে এসেছে সরকারের প্রতিবেদনেও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ বুলেটিন-২০১৪ অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় অংশ হাইপারটেনশনে আক্রান্ত। দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮ শতাংশ এতে আক্রান্ত হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে শঙ্কিত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে প্রতিবেদককে বলেন, উচ্চরক্তচাপ নীরব ঘাতক ব্যাধি। এটি বহুমাত্রিক রোগ হলেও অনেক সময় রোগীরা তা বুঝতে পারে না। ফলে প্রাথমিক চিকিৎসাও তারা নেয় না। এ কারণে হঠাৎ হার্ট ফেইলিউর ও স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও কিডনি ফেইলিউরের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে তারা।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে চট্টগ্রামের প্রথম প্লাস্টিক ওপেন হার্ট সার্জারীর সফল অপারেশন এখানকার চিকিৎসা সেবায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেএক্ষেত্রে রোগীদের বিদেশমুখীতা কিছুটা কমবে বলে আশা করা যাচ্ছে

ডব্লিউএইচওর ‘আ গ্লোবাল ব্রিফ অন হাইপারটেনশন-সাইলেন্ট কিলার, গ্লোবাল পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাইপারটেনশনজনিত বিশেষ কার্ডিওভাসকুলারজনিত রোগে বিশ্বে মারা যাচ্ছে বছরে প্রতি লাখে প্রায় ৩০০ জন। এ রোগে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি, এমন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। আর এশিয়ার দেশ জাপানের মানুষ সবচেয়ে কম আক্রান্ত হচ্ছে এতে।

দীর্ঘমেয়াদি ও অবক্ষয়ী এসব রোগের প্রকোপ বাড়লেও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ছে না। সরকারিভাবে এসব রোগের যথাযথ চিকিৎসা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আবার বেসরকারিভাবে যে সেবা দেয়া হচ্ছে, তাও পর্যাপ্ত নয়। সীমিত সংখ্যক সামর্থ্যবানই কেবল ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের সেবা নিতে পারছেন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটির (এইচআরএমএনসি) সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমেই বিভিন্ন রোগ আসছে। আবার এ রোগগুলো ব্যক্তিকে ধ্বংসের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবনতিরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চক্রাকারে এটি চলতে থাকায় সহজে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ।

চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নে সরকারের উদাসীনতা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বললেও সার্বিকভাবে সরকার তা করতে পারছে না অন্যান্য খাতে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে। স্বাস্থ্যখাতে যে পরিমাণ সরকারি বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এতে তারা সেবা না পেয়ে দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র হবে। তাছাড়া সরকারি হাসপাতালে কারা বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা পাবে, সেটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস (বিএনএইচএ) সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত হলেও এ খাতে সরকারি ব্যয় খুবই কম। এক যুগ আগেও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৭৩ শতাংশ। এছাড়া এ খাতে ব্যয় তখন বাজেটের মোট বরাদ্দের ৬ শতাংশ থাকলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুসারে স্বাস্থ্য খাতে কমপক্ষে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা দরকার। এদিকে বার্ষিক বাজেট কেন্দ্রীয়ভাবে প্রস্তুত করা হয় বলে অঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকারগুলো সেভাবে গুরুত্ব পায় না। এছাড়া সরকারি হাসপাতাল ও সেবার অপ্রতুলতার কারণে স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। এতে চিকিৎসা ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। গড়ে প্রতি বছর ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে ব্যক্তিস্বাস্থ্য ব্যয়।

আবার স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ এখনো জনগণের পকেট থেকেই যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালে স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ (আউট অব পকেট) ছিল মোট খরচের ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশে। আর ২০১২ সালে এটি উন্নীত হয় ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশে। এ সময়ে সরকারের ব্যয় ছিল মাত্র ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তা এসেছে ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং স্বেচ্ছা ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন বাংলাদেশের রোগীরা। এ হার থাইল্যান্ডে মাত্র ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া পাকিন্তানে ৬১ দশমিক ৯, ভারতে ৫৭ দশমিক ৬, শ্রীলংকায় ৪৯ দশমিক ৯, নেপালে ৪৯ দশমিক ২ ও মালয়েশিয়ায় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। আবার ব্যক্তির স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় শতভাগই ব্যয় করতে হচ্ছে ওষুধে। অথচ স্বাস্থ্য খাতে সরকার যে ব্যয় করছে, তার ৪০ শতাংশই আবার অপচয় হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অর্থ ইউনিটের মহাপরিচালক আসাদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ কম থাকলেও অপচয়ের কারণে সে বরাদ্দের পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। শুধু বাজেট বা হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ালে ভালো সেবা পাওয়া সম্ভব নয়। যে বাজেট রয়েছে, তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিতদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে নজর দিতে হবে। স্বল্প ব্যয়েও ভালো সেবা দেয়া যায়, এ ধরনের মানসিকতা গড়ে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। সার্বিকভাবে সরকারের বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থাপনা করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ অন্যান্য ব্যাধির বিস্তার ঠেকাতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ায় সার্বিকভাবে দেশের মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যষ্টিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যক্তির আয় হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর। এসব দিকে দৃষ্টি দিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে, বাড়াতে হবে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়। এছাড়া হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসের রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। দুর্ঘটনার কারণে পঙ্গুত্বের হারও বাড়ছে। ফলে এসব দিকে নজর রেখে দেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ঘটাতে হবে। সেবার মানও উন্নত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণে নজর দিতে হবে। দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো ঢাকায় অবস্থিত হওয়ায় জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার ওপর চিকিৎসা সেবার ব্যয়ও বেশি। অনেকে স্বাস্থ্য বীমা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। তবে সর্বাগ্রে বিশেষায়িত উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং সেবা যেন সুলভ থাকে, তারও পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।

আস্থার সংকটে থাকা দেশের চিকিৎসা সেবা ঘুরে দাঁড়াক- এমনটাই সবার প্রত্যাশা। সেবার মানসিকতা নিয়ে উন্নত হাসপাতার গড়ে উঠুক, চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীদের সন্তুষ্টিচিত্তে ফিরে যাক স্বাভাবিক জীবনে, তা প্রত্যাশা কারাটা বোধ করি সময়ের দাবি।

সাইফ উল আলম : নিবার্হী পরিচালক, মিডিয়া একাডেমি অব চিটাগাং (ম্যাক)। saiful_cu_eco@yahoo.com